May by Known

--: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম :--

اَفَلَا یَعۡلَمُ اِذَا بُعۡثِرَ مَا فِی الۡقُبُوۡرِ ۙ﴿۹﴾

অর্থ: তবে কি সে জানে না যখন কবরে যা আছে তা উত্থিত হবে?
(সূরা আল-আদিয়াত, আয়াতঃ ৯)

তাফসীর: بُعثِر শব্দের অর্থ হল, কবর থেকে মৃতব্যক্তিকে জীবিত করে উঠান হবে।

(তাফসীর আহসানুল বায়ান)

--: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম :--

خَلَقَ الۡاِنۡسَانَ مِنۡ عَلَقٍ ۚ﴿۲﴾

অর্থ: তিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে 'আলাক' থেকে।
(সূরা আল-আলাক্ব, আয়াতঃ ২)

তাফসীর: পূর্বের আয়াতে সমগ্র সৃষ্টিজগত সৃষ্টির বর্ণনা ছিল। এ আয়াতে সৃষ্টিজগতের মধ্য থেকে বিশেষ করে মানব সৃষ্টির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ্ বলেছেন, মানুষকে ‘আলাক’ থেকে সৃষ্টি করেছেন। ‘আলাক’ হচ্ছে ‘আলাকাহ’ শব্দের বহুবচন। এর মানে জমাট বাঁধা রক্ত। সাধারণভাবে বিশ্ব-জাহানের সৃষ্টির কথা বলার পর বিশেষ করে মানুষের কথা বলা হয়েছে যে, মহান আল্লাহ্ কেমন হীন অবস্থা থেকে তার সৃষ্টিপর্ব শুরু করে তাকে পূৰ্ণাংগ মানুষে রূপান্তরিত করেছেন। [কুরতুবী]

(তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া)

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, আদম সন্তান আমাকে কষ্ট দিয়ে থাকে, তারা যুগ বা কালকে গালি দেয়, অথচ আমিই দাহর অর্থাৎ- যুগ বা কাল। আমার হাতেই (কালের পরিবর্তনের) ক্ষমতা। দিন-রাত্রির পরিবর্তন আমিই করে থাকি।
--- মিশকা-তুল মাসা-বীহ (হাদিস একাডেমী), হাদিস নং- ২২।

[সহীহ : বুখারী ৪৮২৬, মুসলিম ২২৪৬, আবূ দাঊদ ৫২৭৪, আহমাদ ৭২৪৫, সহীহাহ্ ৫৩১, সহীহ আল জামি‘ ৪৩৪৩। ]

--: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম :--

یَوۡمَئِذٍ تُحَدِّثُ اَخۡبَارَہَا ۙ﴿۴﴾

অর্থ: সেদিন যমীন তার বৃত্তান্ত বর্ণনা করবে,
(সূরা আল-যিলযাল, আয়াতঃ ৪)

তাফসীর: যমীন কি জানিয়ে দেবে এ নিয়ে মুফাসসেরীনদের মধ্যে কয়েকটি মত রয়েছে। সম্ভবত সব কয়টি মতই এখানে উদ্দেশ্য হতে পারে। এক. ইয়াহইয়া ইবনে সালাম বলেন, এর অর্থ, যমীন তার থেকে যা যা বের করে দিল (সম্পদরাজি) তা জানিয়ে দিবে। এর সমর্থনে একটি হাদীসে এসেছে, “কোন মানুষের জীবন যদি কোন সুনির্দিষ্ট স্থানে অবসান হওয়ার কথা থাকে তখন আল্লাহ্ তার জন্য সেখানে যাওয়ার একটি প্রয়োজন তৈরী করে দেন। তারপর যখন সে স্থানে পৌঁছে তখন তাকে মৃত্যু দেয়া হয়। তারপর যমীন কিয়ামতের দিন বলবে, হে রব! এটা তুমি আমার কাছে আমানত রেখেছিলো।” [ইবনে মাজাহ: ৪২৬৩] দুই. ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, এ আয়াতের অর্থ, আগের আয়াতে যে বলা হয়েছে মানুষ প্রশ্ন করবে, যমীনের কি হল’? এর জওয়াব যমীনই দিবে যে, কিয়ামত অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। তিন. আবু হুৱায়ারা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এর অর্থ, যমীন তার মধ্যে কৃত ভাল-মন্দ যাবতীয় কর্মকাণ্ডের হিসাব দাখিল করবে। যমীনের ওপর যা কিছু ঘটে গেছে তার সবকিছু সে কিয়ামতের দিন বলে দেবে। [কুরতুবী]

(তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া)

--: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম :--

اِذَا الشَّمۡسُ کُوِّرَتۡ ۪ۙ﴿۱﴾

অর্থ: যখন সূর্যকে গুটিয়ে নেয়া হবে।
(সূরা আত-তাকভীর, আয়াতঃ ১)

সূরা সম্পর্কিত তথ্যঃ

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে কেউ কেয়ামতকে প্রত্যক্ষ দেখতে চায় সে যেন সূরা ‘ইযাস সামছু কুওয়িরাত, ইযাস সামায়ুন ফাতারাত ও ইযাস সামায়ূন সাক্কাত’ পড়ে। [তিরমিয়ী: ৩৩৩৩, মুসনাদে আহমাদ: ২/২৭, ৩৬, ১০০, মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/৫১৫] এখানে প্রথম ছয়টি আয়াতের ভাষ্য কিয়ামতের প্রথম অংশ অর্থাৎ শিঙ্গায় প্রথমবার যে ফুৎকার দেয়া হবে তার সাথে সংশ্লিষ্ট। উবাই ইবন কাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, ‘কেয়ামতের পূর্বে ছয়টি নিদর্শন রয়েছে। মানুষ যখন হাটে-বাজারে থাকবে, তখন হঠাৎ সূর্যের আলো চলে যাবে এবং তারকারাজি দেখা যাবে; ফলে তারা আশ্চর্য হবে। তারা তাকিয়ে দেখার সময়েই হঠাৎ করে তারাগুলো খসে পড়বে। এরপর পাহাড়গুলো মাটির উপর পড়বে, নড়া-চড়া করবে: এবং পুড়ে যাবে; ফলে বিক্ষিপ্ত ধুলোর মত হয়ে যাবে। তখন মানুষ জিনের কাছে এবং জিন মানুষের কাছে ছুটে আসবে। জন্তু-জানোয়ার-পাখি সব মিশে যাবে এবং একে অপরের সাথে একত্রিত হবে। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, “আর যখন বন্য পশুগুলোকে একত্র করা হবে” [সূরা তাকভীর: ৫] তারপর জিন মানুষদের বলবে, আমরা তোমাদের নিকট সংবাদ নিয়ে আসছি। তারা যখন সাগরের নিকট যাবে তখন দেখবে তাতে আগুন জ্বলছে। এ সময়ে সপ্ত যমীন পর্যন্ত এবং সপ্ত আসমান পর্যন্ত এক ফাটল ধরবে। এরপর এক বায়ু এসে তাদেরকে মৃত্যুবরণ করাবে।’ [তাবারী]

____________________


তাফসীর: আরবী ভাষায় তাকভীর মানে হচ্ছে গুটিয়ে নেয়া। মাথায় পাগড়ী বাঁধার জন্য “তাকভীরুল ‘ইমামাহ” বলা হয়ে থাকে। কারণ ইমামা তথা পাগড়ী লম্বা কাপড়ের হয়ে থাকে এবং মাথার চারদিকে তা জড়িয়ে নিতে হয়। এই সাদৃশ্য ও সম্পর্কের কারণে সূর্য থেকে যে আলোক রশ্মি বিচ্ছুরিত হয়ে সমগ্র সৌরজগতে ছড়িয়ে পড়ে তাকে পাগড়ীর সাথে তুলনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, কিয়ামতের দিন এই সূর্যকে গুটিয়ে নেয়া হবে। অর্থাৎ তার আলোক বিচ্ছুরণ বন্ধ হয়ে যাবে। তাছাড়া كُوِّرَتْ এর অপর অর্থ নিক্ষেপ করাও হয়ে থাকে। হাদীসে এসেছে, “চাঁদ ও সূর্যকে কিয়ামতের দিন পেঁচিয়ে রাখা হবে।” [বুখারী: ৩২০০] [ইবন কাসীর]

(তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া)

--: সৎভাবে জীবন-যাপন করা সস্পর্কে :--

নাসর ইবন আলী (রহঃ) .... আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মু'মিন ব্যক্তি ভদ্র ও মন ভোলা হয় এবং পাপী ব্যক্তি ধোঁকাবাজ ও হীন-প্রকৃতির হয়।
---আবূ দাঊদ শরীফ (ইফাঃ), হাদিস নং- ৪৭১৫।

--: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম :--

قُتِلَ اَصۡحٰبُ الۡاُخۡدُوۡدِ ۙ﴿۴﴾

অর্থ: ধ্বংস হয়েছে গর্তের অধিপতিরা,
(সূরা আল-বুরুজ, আয়াতঃ ৪)

তাফসীর: এখানে আল্লাহ্ তা‘আলা চারটি বস্তুর শপথ করার পর মূল কথা বর্ণনা করেছেন। (এক) বুরূজবিশিষ্ট আকাশের; (দুই) কেয়ামত দিবসের; (তিন) আরাফার দিনের এবং (চার) শুক্রবারের। এসব শপথের সম্পর্ক এই যে, এগুলো আল্লাহ্ তা'আলার পরিপূর্ণ শক্তি, কেয়ামতের হিসাব-নিকাশ এবং শাস্তি ও প্রতিদানের দলীল। শুক্রবার ও আরাফার দিন মুসলিমদের জন্যে আখেরাতের পুঁজি সংগ্রহের পবিত্ৰ দিন।

যারা বড় বড় গর্তের মধ্যে আগুন জ্বালিয়ে ঈমানদারদেরকে তার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল এবং তাদের জ্বলে পুড়ে মরার বীভৎস দৃশ্য নিজেদের চোখে দেখেছিল তাদেরকে এখানে গর্তওয়ালা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, তাদের ওপর আল্লাহ্র লা‘নত পড়েছিল এবং তারা আল্লাহ্র আযাবের অধিকারী হয়েছিল। [ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর] এর আরেক অর্থ ধ্বংস হয়েছিল। [সা‘দী]
গর্তে আগুন জ্বলিয়ে ঈমানদারদেরকে তার মধ্যে নিক্ষেপ করার ঘটনা সহীহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। সুহাইব রুমী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। এক বাদশার কাছে একজন যাদুকর ছিল। বৃদ্ধ বয়সে সে বাদশাহকে বললো, একটি ছেলেকে আমার কাছে নিযুক্ত করো, সে আমার কাছ থেকে এ জাদু শিখে নেবে। বাদশাহ জাদু শেখার জন্য জাদুকরের কাছে একটি ছেলেকে নিযুক্ত করলো। কিন্তু সেই ছেলেটি জাদুকরের কাছে আসা যাওয়ার পথে একজন রাহেবের (যিনি সম্ভবত ঈসা আলাইহিস সালামের দ্বীনের অনুসারী একজন সাধক ছিলেন) সাক্ষাত গুণে সে অলৌকিক শক্তির অধিকারীও হয়ে গেলো। সে অন্ধদের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিতে এবং কুষ্ঠরোগ নিরাময় করতে লাগলো। ছেলেটি তাওহীদের প্রতি ঈমান এনেছে, একথা জানতে পেরে বাদশাহ প্ৰথমে রাহেবকে হত্যা করলো তারপর ছেলেটিকে হত্যা করতে চাইলো। কিন্তু কোন অস্ত্ৰ দিয়েই এবং কোনভাবেই তাকে হত্যা করতে পারলো না। শেষে ছেলেটি বললো, যদি তুমি আমাকে হত্যা করতে চাও তাহলে প্রকাশ্য জনসমাবেশে “বিস্মি রাব্বিল গুলাম” (অর্থাৎ এই ছেলেটির রবের নামে) বাক্য উচ্চারণ করে আমাকে তীর মারো, তাতেই আমি মারা যাবো। বাদশাহ তাই করলো। ফলে ছেলেটি মারা গেলো। এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে লোকেরা চিৎকার করে উঠলো, আমরা এই ছেলেটির রবের প্রতি ঈমান আনলাম। বাদশাহর সভাসদরা তাকে বললো, এখন তো তাই হয়ে গেলো যা থেকে আপনি বাঁচতে চাচ্ছিলেন। লোকেরা আপনার ধর্ম ত্যাগ করে এ ছেলেটির ধর্মগ্রহণ করেছে। এ অবস্থা দেখে বাদশাহ অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলো। সে রাস্তার পাশে গর্ত খনন করালো। তাতে আগুন জ্বালালো। যারা ঈমান ত্যাগ করতে রাজী হলো না তাদের সবাইকে তার মধ্যে নিক্ষেপ করলো। [মুসলিম: ৩০০৫ তিরমিয়ী: ৩৩৪০]।

(তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া)

--: ক্রোধ সম্বরণের ফযীলত সম্পর্কে :--

আবূ বকর ইবন আবূ শায়বা (রহঃ) ..... আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করেনঃ তোমরা কাকে শ্রেষ্ঠ মল্লযোদ্ধা বলে মনে কর? সাহাবীগণ বলেনঃ যাকে কেউ ধরাশায়ী করতে পারে না, তাকে। তখন তিনি বলেনঃ না বরং সে ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ মল্লযোদ্ধা, যে রাগের সময় তার ক্রোধকে সম্বরণ করতে পারে।
--- আবু দাঊদ শরীফ (ইফাঃ), হাদিস নং- ৪৭০৪।

--: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম :--

وَ اِذَا الۡاَرۡضُ مُدَّتۡ ۙ﴿۳﴾

অর্থ: আর যখন যমীনকে সম্প্রসারিত করা হবে।
(সূরা আল-ইনশিক্বাক্ব, আয়াতঃ ৪)

তাফসীর: مُدّت এর অর্থ টেনে লম্বা করা, ছড়িয়ে দেয়া। [ইবন কাসীর] পৃথিবীকে ছড়িয়ে দেবার মানে হচ্ছে, সাগর নদী ও সমস্ত জলাশয় ভরে দেয়া হবে। পাহাড়গুলো চুৰ্ণবিচূর্ণ করে চারিদিকে ছড়িয়ে দেয়া হবে। পৃথিবীর সমস্ত উঁচু নীচু জায়গা সমান করে সমগ্ৰ পৃথিবীটাকে একটি সমতল প্রান্তরে পরিণত করা হবে। কুরআনের অন্যত্র এই অবস্থাটিকে নিমোক্তভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, মহান আল্লাহ্ “তাকে একটা সমতল প্রান্তরে পরিণত করে দেবেন। সেখানে তোমরা কোন উঁচু জায়গা ও ভাঁজ দেখতে পাবে না।” [সূরা ত্ব-হা: ১০৬-১০৭] হাদীসে এসেছে, ‘কেয়ামতের দিন পৃথিবীকে চামড়ার ন্যায় টেনে সম্প্রসারিত করা হবে। তারপর মানুষের জন্য সেখানে কেবলমাত্র পা রাখার জায়গাই থাকবে।” [মুস্তাদরাকে হাকিম: ৪/৫৭১] একথাটি ভালোভাবে বুঝে নেয়ার জন্য এ বিষয়টিও সামনে রাখতে হবে যে, সেদিন সৃষ্টির প্রথম দিন থেকে নিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষের জন্ম হয়েছে ও হবে সবাইকে একই সংগে জীবিত করে আল্লাহ্র আদালতে পেশ করা হবে। এ বিরাট জনগোষ্ঠীকে এক জায়গায় দাঁড় করাবার জন্য সমস্ত সাগর, নদী, জলাশয়, পাহাড়, পর্বত, উপত্যকা, মালভূমি, তথা উঁচু-নীচু সব জায়গা ভেঙ্গে-চুরে ভরাট করে সারা দুনিয়াটাকে একটি বিস্তীর্ণ প্রান্তরে পরিণত করা হবে। [দেখুন, ফাতহুল কাদীর; সা‘দী]

(তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া)

--: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম :--

یَّوۡمَ یَقُوۡمُ النَّاسُ لِرَبِّ الۡعٰلَمِیۡنَ ؕ﴿۶﴾

অর্থ: যেদিন মানুষ সৃষ্টিকুলের রবের জন্য দাঁড়াবে।
(সারা আল-মুতাফফিফীন, আয়াতঃ ৬)

তাফসীর: ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ‘যেদিন সমস্ত মানুষ জগতসমূহের রবের সামনে দাঁড়াবে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ তাদের কানের মধ্যভাগ পর্যন্ত ঘামে ডুবে থাকবে।’ [বুখারী: ৬৫৩১, মুসলিম: ২৮৬২] অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ‘কিয়ামতের দিন সূর্যকে সৃষ্টির এত নিকটে আনা হবে যে, তাদের মধ্যে দুরত্ব হবে এক ‘মাইল’ । বর্ণনাকারী বলেন: আমি জানি না এখানে মাইল বলে পরিচিত এক মাইল না সুরমাদানি (যা আরবিতে মাইল বলা হয় তা) বুঝানো হয়েছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘মানুষ তাদের স্বীয় আমল অনুযায়ী ঘামের মধ্যে নিমজ্জিত থাকবে। কারও ঘাম হবে গোড়ালি পর্যন্ত, কারও হবে হাঁটু পর্যন্ত। আবার কারও ঘাম হবে কোমর পর্যন্ত; কারও ঘাম মুখের লাগামের মত হবে।’ তারপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার মুখের দিকে ইশারা করেন। [মুসলিম: ২৮৬৪]

(তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া)

--: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম :--

اَفَلَا یَنۡظُرُوۡنَ اِلَی الۡاِبِلِ کَیۡفَ خُلِقَتۡ ﴿ٝ۱۷﴾

অর্থ: তবে কি তারা উটের প্রতি দৃষ্টিপাত করে না, কীভাবে তা সৃষ্টি করা হয়েছে?
(সূরা আল-গাশিয়াহ, আয়াতঃ ১৭)

আয়াতের তাফসীর:

এ আয়াতগুলোতে মানব জাতিকে আল্লাহ তা‘আলার কয়েকটি মাখলুকের প্রতি চিন্তার দৃষ্টিতে তাকানোর নির্দেশ করে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে উপদেশদাতা হিসাবেই বহাল থাকার নির্দেশ করেছেন। কেননা তিনি একজন উপদেশদাতা মাত্র, কোন দারোগা নন।

(إِلَي الْإِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْ)

অর্থাৎ যারা আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূল (সাঃ)-কে বিশ্বাস করে না তাদের এবং অন্যান্য সকল মানুষকে অনুপ্রাণিত করে আল্লাহ তা‘আলা বলছেন: তারা কি উটের প্রতি লক্ষ্য করে না, কিভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে? সে মানুষ ও বোঝা বহুদূর বহন করে নিয়ে যায়, তার গোশত খায়, পশম কাজে লাগায়, তার দুধ পানসহ আরো অনেক উপকার নিয়ে থাকে। এখানে সবাগ্রে উটের কথা নিয়ে আসার কারণ হলো আরবরা সাধারণত উটের দ্বারাই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়ে থাকে। উট আরববাসীর নিকট সর্বাধিক ব্যবহৃত প্রাণী।


আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:

১. আল্লাহ তা‘আলার বড় বড় নিদর্শনের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার পরিচয় পাওয়া যায়।

(তাফসীর ফাতহুল মাজীদ)

--: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম :--

تَبَّتۡ یَدَاۤ اَبِیۡ لَہَبٍ وَّ تَبَّ ؕ﴿۱﴾

অর্থ: ধ্বংস হোক আবূ লাহাবের দু’হাত এবং সে নিজেও ধ্বংস হোক।
(সূরা লাহাব, আয়াত: ০১)


সূরা সম্পর্কিত তথ্যঃ

হাদীসে এসেছে, আল্লাহ্র বাণী

وَاَنْذِرْعَشِيْرَ تَكَ الْاَقْرَ بِيْنَ

“আর আপনি আপনার গোত্রের নিকটাত্মীয়দেরকে ভীতি প্রদর্শন করুন” [সূরা আশ-শু‘আরা: ২১৪] এ আয়াতটি অবতীর্ণ হলে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাফা পর্বতে আরোহণ করে কোরাইশ গোত্রের উদ্দেশ্যে وَا صَبَاحَاه (‘হায়! সকাল বেলার বিপদ’) বলে অথবা আবদে মানাফ ও আবদুল মোত্তালিব ইত্যাদি নাম সহকারে ডাক দিলেন। (এভাবে ডাক দেয়া তখন আরবে বিপদাশঙ্কার লক্ষণরূপে বিবেচিত হত) ডাক শুনে কোরাইশ গোত্র পর্বতের পাদদেশে একত্রিত হল। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: যদি আমি বলি যে, একটি শত্রুদল ক্রমশই এগিয়ে আসছে এবং সকাল বিকাল যে কোন সময় তোমাদের ওপর ঝাপিয়ে পড়বে, তবে তোমরা আমার কথা বিশ্বাস করবে কি? সবাই একবাক্যে বলে উঠল: হ্যাঁ, অবশ্যই বিশ্বাস করব। অতঃপর তিনি বললেন: আমি (শিরক ও কুফরের কারণে আল্লাহ্র পক্ষ থেকে নির্ধারিত) এক ভীষণ আযাব সম্পর্কে তোমাদেরকে সতর্ক করছি। এ কথা শুনে আবু লাহাব বলল, تَبًا لَكَ أَلِهٰذَا جِمَعْتَنَا ‘ধ্বংস হও তুমি, এজন্যেই কি আমাদেরকে একত্রিত করেছ’? অতঃপর সে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে পাথর মারতে উদ্যত হল। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সূরা লাহাব অবতীর্ণ হয়। [বুখারী: ৪৯৭১,৪৯৭২, মুসলিম:২০৮]

আবু লাহাবের আসল নাম ছিল আবদুল উযযা। সে ছিল আবদুল মুত্তালিবের অন্যতম সন্তান। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা। গৌরবর্ণের কারণে তার ডাক নাম হয়ে যায় আবু লাহাব। কারণ, ‘লাহাব’ বলা হয় আগুণের লেলিহান শিখাকে। লেলিহান শিখার রং হচ্ছে গৌরবর্ণ। সে অনুসারে আবু লাহাব অর্থ, গৌরবর্ণবিশিষ্ট। পবিত্র কুরআন তার আসল নাম বর্জন করেছে। কারণ, সেটা মুশরিকসুলভ। এছাড়া আবু লাহাব ডাক নামের মধ্যে জাহান্নামের সাথে বেশ মিলও রয়েছে। কারণ, জাহান্নামের অগ্নির লেলিহান শিখা তাকে পাকড়াও করবে। সে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কট্টর শত্রু ও ইসলামের ঘোর বিরোধী ছিল। সে নানাভাবে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে কষ্ট দেয়ার প্রয়াস পেত। তিনি যখন মানুষকে ঈমানের দাওয়াত দিতেন, তখন সে সাথে সাথে গিয়ে তাকে মিথ্যাবাদী বলে প্রচার করত। রবী‘আ ইবনে আব্বাদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জাহিলিয়াতের (অন্ধকার) যুগে যুল-মাজায বাজারে দেখলাম, তিনি বলছিলেন, “হে মানব সম্প্রদায়! তোমরা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ বল, সফলকাম হবে” । আর মানুষ তার চতুস্পার্শে ভীড় জমাচ্ছিল। তার পিছনে এক গৌরবর্ণ টেরা চোখবিশিষ্ট সুন্দর চেহারার লোক বলছিল, এ লোকটি ধর্মত্যাগী, মিথ্যাবাদী। এ লোকটি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিছনে পিছনে যেখানে তিনি যেতেন সেখানেই যেত। তারপর আমি লোকদেরকে এ লোকটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। লোকেরা বলল, এটি তারই চাচা আবু লাহাব।” [মুসনাদে আহমাদ: ৪/৩৪১]

অন্য বর্ণনায়, রবী‘আ ইবনে আব্বাদ বলেন, আমি আমার পিতার সাথে ছিলাম। আমি যেন দেখতে পাচ্ছি কিভাবে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন গোত্রের কাছে নিজেকে পেশ করে বলছিলেন, “হে অমুক বংশ! আমি তোমাদের সবার নিকট আল্লাহ্র রাসূল। তোমাদেরকে আল্লাহ্র ইবাদত করতে এবং তার সাথে কাউকে শরীক না করতে নির্দেশ দিচ্ছি। আর আমি এটাও চাই যেন তোমরা সত্য বলে বিশ্বাস কর এবং আমার পক্ষ থেকে প্রতিরোধ কর, যাতে করে আমি আমার আল্লাহ্র কাছ থেকে যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছি তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি।” যখনই তিনি এ কথাগুলো বলে শেষ করতেন তখনই তার পিছন থেকে এক লোক বলত: হে অমুক বংশ! সে তোমাদেরকে লাত ও উযযা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়- সে নতুন কথা চালু করেছে, সে ভ্ৰষ্টতা নিয়ে এসেছে। সুতরাং তোমরা তার কথা শোনবে না এবং তার অনুসরণ করবে না। তখন আমি আমার পিতাকে বললাম, এ লোকটি কে ? তিনি বললেন, ঐ লোকটির চাচা আবু লাহাব। [মুসনাদে আহমাদ: ৩/৪৯২] [ফাতহুল কাদীর, ইবন কাসীর]

আর يد শব্দের অর্থ হাত। মানুষের সব কাজে হাতের প্রভাবই বেশি, তাই কোন ব্যক্তির সত্তাকে হাত বলেই ব্যক্ত করে দেয়া হয়; যেমন কুরআনের অন্যত্র بِمَا قَدَّ مَتْ يَدٰكَ বলা হয়েছে। تَبَّتْ يَدَٓ ااَبِىْ لَهَبٍ এর অর্থ কোন তাফসীরকার করেছেন, “ভেঙে যাক আবু লাহাবের হাত” এবং وتبّ শব্দের মানে করেছেন, “সে ধ্বংস হয়ে যাক” অথবা “সে ধ্বংস হয়ে গেছে।” কোন কোন তাফসীরকার বলেন, এটা আবু লাহাবের প্রতি একটি ভবিষ্যদ্বাণী। এখানে ভবিষ্যতে যে ঘটনাটি ঘটবে তাকে অতীত কালের অর্থ প্রকাশক শব্দের সাহায্যে বর্ণনা করা হয়েছে। এর মানে, তার হওয়াটা যেন এত বেশী নিশ্চিত যেমন তা হয়ে গেছে। আর যা এ সূরায় কয়েক বছর আগে বর্ণনা করা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তাই সত্য হলো। এখানে হাত ভেঙে যাওয়ার মানে শুধু শরীরের একটি অংগ যে হাত সেটি ভেঙে যাওয়াই নয়। বরং কোন ব্যক্তি যে উদ্দেশ্য সম্পন্ন করার জন্য তার সর্বশক্তি নিয়োগ করে তাতে পুরোপুরি ও চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়ে যাওয়াই এখানে বুঝানো হয়েছে। [কুরতুবী, ফাতহুল কাদীর] আর আবু লাহাব রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দাওয়াতকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য যথার্থই নিজের সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল। কিন্তু এ সূরাটি নাযিল হবার মাত্র সাত আট বছর পরেই বদরের যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। এ যুদ্ধে কুরাইশদের অধিকাংশ বড় বড় সরদার নিহত হয়। তারা সবাই ইসলাম বিরোধিতা ও ইসলামের প্রতি শত্রুতার ক্ষেত্রে আবু লাহাবের সহযোগী ছিল। এ পরাজয়ের খবর মক্কায় পৌছার পর সে যত বেশী মর্মাহত হয় যে, এরপর সে সাত দিনের বেশী জীবিত থাকতে পারেনি। যে দ্বীনের অগ্রগতির পথ রোধ করার জন্য সে তার সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল তার সন্তানদের সেই দ্বীন গ্ৰহণ করার মধ্য দিয়ে তার আরো বেশী ও পূর্ণ পরাজয় সম্পন্ন হয়। সর্বপ্রথম তার মেয়ে দাররা হিজরত করে মক্কা থেকে মদীনায় চলে যান এবং ইসলাম গ্ৰহণ করেন। আর মক্কা বিজয়ের পর তার দুই ছেলে উতবা ও মু‘আত্তাব রাসূলুল্লাহ্র সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সামনে হাযির হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তার হাতে বাইআত করেন। [রুহুল মা‘আনী]

(তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া)

--: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম :--

إِنَّ الْإِنسٰنَ لَفِى خُسْرٍ

অর্থ: নিশ্চয় সকল মানুষ ক্ষতিগ্রস্ততায় নিপতিত।
(সূরা আল-আসর, আয়াতঃ ২)

তাফসীর: মানুষ শব্দটি একবচন। এখানে মানুষ বলে সমস্ত মানুষই উদ্দেশ্য। কারণ, পরের বাক্যে চারটি গুণ সম্পন্ন লোকদেরকে তার থেকে আলাদা করে নেয়া হয়েছে। তাই এটা অবশ্যি মানতে হবে যে, এখানে মানুষ শব্দটিতে দুনিয়ার সমস্ত মানুষ সমানভাবে শামিল। কাজেই উপরোল্লিখিত চারটি গুণাবলী কোন ব্যক্তি, জাতি বা সারা দুনিয়ার সমস্ত মানুষ যার-ই মধ্যে থাকবে না সেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এই বিধানটি সর্বাবস্থায় সত্য প্রমাণিত হবে। [আদ্ওয়াউল বায়ান, ফাতহুল কাদীর]

আভিধানিক অর্থে ক্ষতি হচ্ছে লাভের বিপরীত শব্দ। ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে এ শব্দটির ব্যবহার এমন সময় হয় যখন কোন একটি সওদায় লোকসান হয়, পুরো ব্যবসাটায় যখন লোকসান হতে থাকে। আবার সমস্ত পুঁজি লোকসান দিয়ে যখন কোন ব্যবসায়ী দেউলিয়া হয়ে যায় তখনো এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। [ফাতহুল কাদীর]

(তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া)

--: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম :--

قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِىٓ إِبْرٰهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُۥٓ إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَءٰٓؤُا مِنكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدٰوَةُ وَالْبَغْضَآءُ أَبَدًا حَتّٰى تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَهُۥٓ إِلَّا قَوْلَ إِبْرٰهِيمَ لِأَبِيهِ لَأَسْتَغْفِرَنَّ لَكَ وَمَآ أَمْلِكُ لَكَ مِنَ اللَّهِ مِن شَىْءٍ ۖ رَّبَّنَا عَلَيْكَ تَوَكَّلْنَا وَإِلَيْكَ أَنَبْنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ

অর্থ: ইবরাহীম ও তার সাথে যারা ছিল তাদের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ। তারা যখন স্বীয় সম্প্রদায়কে বলছিল, ‘তোমাদের সাথে এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যা কিছুর উপাসনা কর তা হতে আমরা সম্পর্কমুক্ত। আমরা তোমাদেরকে অস্বীকার করি; এবং উদ্রেক হল আমাদের- তোমাদের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ চিরকালের জন্য; যতক্ষণ না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আন। তবে স্বীয় পিতার প্রতি ইবরাহীমের উক্তিটি ব্যতিক্রম: ‘আমি অবশ্যই তোমার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করব আর তোমার ব্যাপারে আল্লাহর কাছে আমি কোন অধিকার রাখি না।’ হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা আপনার ওপরই ভরসা করি, আপনারই অভিমুখী হই আর প্রত্যাবর্তন তো আপনারই কাছে।
(সূরা আল-মুমতাহিনাহ, আয়াতঃ ৪)

তাফসীর: হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আমাকে মানুষের সাথে ততক্ষণ পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যেতে বলা হয়েছে। যতক্ষণ তারা এ সাক্ষ্য দিবে না যে, “আল্লাহ ছাড়া কোন হক ইলাহ নেই, আর মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আর সালাত কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে। তারা এটা করলে আমার হাত থেকে তাদের জান ও মাল নিরাপদ করতে পারবে। তবে ইসলামের কোন হকের কারণে যদি পাকড়াও করা হয় সেটা ভিন্ন কথা। আর তাদের হিসাবের দায়িত্বভার আল্লাহর উপরই রইল।” [বুখারী: ২৫, মুসলিম: ২২]

মুসলিমদেরকে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর উত্তম আদর্শ ও সুন্নাত অনুসরণ করার জোর আদেশ দেয়ার পর ইবরাহীম আলাইহিসসালাম যে তার মুশরিক পিতার জন্যে ক্ষমাপ্রার্থনা করেছিলেন ইবরাহিমী আদর্শের অনুসরণ থেকে একে ব্যতিক্রম প্রকাশ করে বলা হয়েছে যে, অন্যসব বিষয়ে ইবরাহিমী আদর্শের অনুসরণ জরুরী, কিন্তু তার এই কাজটির অনুসরণ মুসলিমদের জন্যে জায়েয নয়। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর ওযর সূরা আত-তাওবায় বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি পিতার জন্যে মাগফিরাতের দো'আ নিষেধাজ্ঞার পূর্বে করেছিলেন, অথবা এই ধারণার বশবর্তী হয়ে করেছিলেন যে, তার অন্তরে ঈমান বিদ্যমান আছে, কিন্তু পরে যখন জানলেন যে, সে আল্লাহর দুশমন তখন এ বিষয় থেকেও নিজের বিমুখতা ঘোষণা করলেন। [দেখুন-বাগভী]
(তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া)

--: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম :--

اِذَا جَآءَ نَصۡرُ اللّٰہِ وَ الۡفَتۡحُ ۙ﴿۱﴾

অর্থ: যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে,
(সূরা আন-নাসর, আয়াতঃ ১)

তাফসীর: আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, যখন এ সূরা নাযিল হলো তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সূরাটি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পড়লেন এবং বললেন, “মক্কা বিজয়ের পর আর কোন হিজরত নেই।“ [মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/২৫৭] এ সূরায় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওফাত নিকটবর্তী হওয়ার ইঙ্গিত আছে। এক বর্ণনায় আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা উবায়দুল্লাহ্ ইবনে উতবাকে প্রশ্ন করে বলেন, কোন পূর্ণাঙ্গ সূরা সবশেষে নাযিল হয়েছে? উবায়দুল্লাহ্ বলেন, আমি বললাম: “ইযা জাআ নাসরুল্লাহি ওয়াল ফাতহ’। তিনি বললেন, সত্য বলেছ। [মুসলিম: ৩০২৪] ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, সূরা আন-নাসর বিদায় হজে অবতীর্ণ হয়েছে। এরপর

اَلْيَوْمَ اَكْمَلْتُ لَكُمْ دِيْنَكُمْ

[সূরা আল-মায়িদাহ: ৩] আয়াত অবতীর্ণ হয়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাত্র আশি দিন জীবিত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনের যখন মাত্র পঞ্চাশ দিন বাকি ছিল, তখন কালালাহ্ সংক্রান্ত [সূরা আন-নিসা: ১৭৬] আয়াত অবতীর্ণ হয়। অতঃপর পঁয়ত্রিশ দিন বাকী থাকার সময়

لَقَدْ جَآءَكُمْ رَسُوْلٌ مِّنْ اَنْفُسِكُمْ عَزِيْزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيْصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْ مِنِيْنَ رَءُوْفٌ رَّحِيْمٌ

আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং একুশ দিন বাকি থাকার সময়

وَاتَّقُوا يَوْمًا تُرْجَعُونَ فِيهِ إِلَى اللَّهِ ۖ ثُمَّ تُوَفَّىٰ كُلُّ نَفْسٍ مَّا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ

[সূরা আল-বাকারাহ: ২৮১] আয়াত অবতীর্ণ হয়।


এ ব্যাপারে প্রায় সকলেই একমত যে, এখানে বিজয় বলে মক্কা বিজয় বোঝানো হয়েছে। [মুয়াসসার, ইবন কাসীর] আর বিজয় মানে কোন একটি সাধারণ যুদ্ধে বিজয় নয়। বরং এর মানে হচ্ছে এমন একটি চুড়ান্ত বিজয় যার পরে ইসলামের সাথে সংঘর্ষ করার মতো আর কোন শক্তির অস্তিত্ব দেশের বুকে থাকবে না এবং একথাও সুস্পষ্ট হয়ে যাবে যে, বর্তমানে আরবে এ দ্বীনটিই প্রাধান্য বিস্তার করবে। [দেখুন, আদ্ওয়াউল বায়ান]

(তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া)

আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: “নিশ্চয় সর্বপ্রথম ব্যক্তি কিয়ামতের দিন যার ওপর ফয়সালা করা হবে, সে ব্যক্তি যে শহীদ হয়েছিল। তাকে আনা হবে, অতঃপর তাকে তার (আল্লাহর) নিয়ামতরাজি জানানো হবে, সে তা স্বীকার করবে। তিনি বলবেন: তুমি এতে কি আমল করেছ? সে বলবে: আপনার জন্য জিহাদ করে এমনকি শহীদ হয়েছি। তিনি বলবেন: মিথ্যা বলেছ, তবে তুমি এ জন্য জিহাদ করেছ যেন বলা হয়: বীর, অতএব বলা হয়েছে। অতঃপর তার ব্যাপারে নির্দেশ দেয়া হবে, তাকে তার চেহারার ওপর ভর করে টেনে-হিঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। আরও এক ব্যক্তি যে ইলম শিখেছে, শিক্ষা দিয়েছে ও কুরআন তিলাওয়াত করেছে, তাকে আনা হবে। অতঃপর তাকে তার নিয়ামতরাজি জানানো হবে, সে তা স্বীকার করবে। তিনি বলবেন: তুমি এতে কি আমল করেছ? সে বলবে: আমি ইলম শিখেছ, শিক্ষা দিয়েছি ও আপনার জন্য কুরআন তিলাওয়াত করেছি। তিনি বলবেন: মিথ্যা বলেছ, তবে তুমি ইলম শিক্ষা করেছ যেন বলা হয়: আলেম, কুরআন তিলাওয়াত করেছ যেন বলা হয়: সে কারী, অতএব বলা হয়েছে। অতঃপর তার ব্যাপারে নির্দেশ দেয়া হবে, তাকে চেহারার ওপর ভর করে টেনে-হিঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। আরও এক ব্যক্তি যাকে আল্লাহ সচ্ছলতা দিয়েছেন ও সকল প্রকার সম্পদ দান করেছেন, তাকে আনা হবে। তাকে তার নিয়ামতরাজি জানানো হবে, সে তা স্বীকার করবে। তিনি বলবেন: তুমি এতে কি আমল করেছ? সে বলবে: এমন খাত নেই যেখানে খরচ করা আপনি পছন্দ করেন আমি তাতে আপনার জন্য খরচ করি নাই। তিনি বলবেন: মিথ্যা বলেছ, তবে তুমি করেছ যেন বলা হয়: সে দানশীল, অতএব বলা হয়েছে, অতঃপর তার ব্যাপারে  নির্দেশ দেয়া হবে, তাকে তার চেহারার ওপর ভর করে টেনে-হিঁচড়ে অতঃপর জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে”।
---সহীহ হাদিসে কুদসি (ইসলাম হাউজ), হাদিস নং- ৫।

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তিন জনের একটি দল নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইবাদাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিবিগণের গৃহে আগমন করল। যখন তাঁদেরকে এ সম্পর্কে অবহিত করা হলো, তখন তারা ইবাদাতের পরিমাণ যেন কম মনে করল এবং বলল, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সমকক্ষ হতে পারি না। কারণ, তার আগের ও পরের সকল গুনাহ্ মাফ করে দেয়া হয়েছে। এমন সময় তাদের মধ্য থেকে একজন বলল, আমি সারা জীবন রাতের সলাত আদায় করতে থাকব। অপর একজন বলল, আমি সারা বছর রোযা পালন করব এবং কখনও বিরতি দিব না। অপরজন বলল, আমি নারী বিবর্জিত থাকব-কখনও বিয়ে করব না।

এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নিকট এলেন এবং বললেন, তোমরা কি ঐ সকল ব্যক্তি যারা এরূপ কথাবার্তা বলেছ? আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে অধিক ভয় করি এবং তোমাদের চেয়ে তাঁর প্রতি আমি অধিক আনুগত্যশীল; অথচ আমি রোযা পালন করি, আবার রোষা থেকে বিরতও থাকি। সলাত আদায় করি এবং ঘুমাই ও বিয়ে-শাদী করি। সুতরাং যে আমার সুন্নাহ বিমুখ হবে সে আমার দলভুক্ত নয়।
---আল-লু'লু' ওয়াল মারজান (তাওহীদ), হাদিস নং- ৮৮৫।

[সহীহুল বুখারী, পৰ্ব ৬৭ : বিবাহ, অধ্যায় ১, হাঃ ৫০৬৩; মুসলিম, পৰ্ব ১৬ : নিকাহ বিবাহঃ, হাঃ ১৪০১ ]

--: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম :--

اِنَّاۤ اَعۡطَیۡنٰکَ الۡکَوۡثَرَ ؕ﴿۱﴾

অর্থ: নিশ্চয় আমি তোমাকে আল-কাউসার দান করেছি।
(সূরা আল-কাউসার, আয়াতঃ ১)

সূরা সম্পর্কিত তথ্যঃ
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন, ‘কাউসার’ সেই অজস্র কল্যাণ যা আল্লাহ্ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দান করেছেন। ইকরিমা বলেন, এটা নবুওয়ত, কুরআন ও আখেরাতের সওয়াব। অনুরূপভাবে, কাউসার জান্নাতের একটি প্রস্রবনের নাম। এ তাফসীরসমূহে কোন বিরোধ নেই; কারণ, কাউসার নামক প্রস্রবনটি অজস্র কল্যাণের একটি। আসলে কাউসার শব্দটি এখানে যেভাবে ব্যবহৃত হয়েছে তাতে এক শব্দে এর পূর্ণ অর্থ প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এ শব্দটি মূলে কাসরাত كثرة থেকে বিপুল ও অত্যধিক পরিমাণ বুঝাবার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, সীমাহীন আধিক্য। কিন্তু যে অবস্থায় ও পরিবেশে শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে তাতে শুধুমাত্র আধিক্য নয় বরং কল্যাণ ও নিয়ামতের আধিক্য এবং এমন ধরনের আধিক্যের ধারণা পাওয়া যায় যা বাহুল্য ও প্রাচুর্যের সীমান্তে পৌছে গেছে। আর এর অর্থ কোন একটি কল্যাণ বা নিয়ামত নয় বরং অসংখ্য কল্যাণ ও নিয়ামতের আধিক্য, যার মধ্যে একটি হল জান্নাতের প্রস্রবন। [ইবন কাসীর]

----------------------

তাফসীর : বিভিন্ন হাদীসে কাউসার ঝর্ণাধারার কথা বর্ণিত হয়েছে। আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে আমাদের সামনে উপস্থিত ছিলেন। হঠাৎ তার মধ্যে তন্দ্রা অথবা এক প্রকার অচেতনতার ভাব দেখা দিল। অতঃপর তিনি হাসিমুখে মাথা উঠালেন। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ আপনার হাসির কারণ কি? তিনি বললেন, এই মুহুর্তে আমার নিকট একটি সূরা নাযিল হয়েছে। অতঃপর তিনি বিসমিল্লাহ্ সহ সূরা আল-কাউসার পাঠ করলেন এবং বললেন, তোমরা জান, কাউসার কি? আমরা বললাম, আল্লাহ্ তা‘আলা ও তার রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেন, এটা জান্নাতের একটি নহর। আমার রব আমাকে এটা দেবেন বলে ওয়াদা করেছেন। এতে অজস্র কল্যাণ আছে এবং এই হাউযে কেয়ামতের দিন আমার উম্মত পানি পান করতে যাবে। এর পানি পান করার পাত্ৰ সংখ্যা আকাশের তারকাসম হবে। তখন কতক লোককে ফেরেশতাগণ হাউয থেকে হটিয়ে দিবে। আমি বলব, হে রব! সে তো আমার উম্মত। আল্লাহ্ তা‘আলা বলবেন, আপনি জানেন না, আপনার পরে তারা নতুন মত ও পথ অবলম্বন করেছিল।” [মুসলিম: ৪০০, মুসনাদে আহমাদ: ৩/১০২] অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “ইসরা ও মিরাজের রাত্রিতে আমাকে এক প্রস্রবনের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো যার দু’তীর ছিল মুক্তার খালি গম্বুজে পরিপূর্ণ, আমি বললাম, জিবরাঈল এটা কি? তিনি বললেন, এটাই কাউসার” [বুখারী: ৪৯৬৪]

অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আমাকে কাউসার দান করা হয়েছে, সেটা হচ্ছে, প্রবাহিত একটি নহর। যা কোন খোদাই করা বা ফাটিয়ে বের করা হয়নি। আর তার দুই তীর মুক্তার খালি গম্বুজ। আমি তার মাটিতে আমার দু’হাত মারলাম, দেখলাম তা সুগন্ধি মিস্ক আর তার পাথরকুচি মুক্তোর।” [মুসনাদে আহমাদ: ৩/১৫২] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, “কাউসার হচ্ছে এমন একটি নাহর যা আল্লাহ্ আমাকে জান্নাতে দান করেছেন, তার মাটি মিসকের, দুধের চেয়েও সাদা, মধুর চেয়েও সুমিষ্ট, এতে এমন এমন পাখি নামবে যেগুলোর ঘাড় উটের ঘাড়ের মত। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! এগুলো তো খুব সুস্বাদু নিশ্চয়। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যারা এগুলো খাবে তারা আরও কোমল মানুষ” । [তাবারী: ৩৮১৭৪, মুসনাদে আহমাদ: ৩/২২১, তবে মুসনাদে আহমদে আবুবকরের পরিবর্তে উমরের কথা এসেছে। অন্য বর্ণনায় এসেছে, “তার পেয়ালাগুলোর সংখ্যা আকাশের তারকাদের সংখ্যার অনুরূপ”। [বুখারী: ৪৯৬৫] মোটকথা: হাউযের অস্তিত্ব ও বাস্তবতা অনেক সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে। কোন কোন অভিজ্ঞ আলেম উল্লেখ করেছেন যে, এ হাদীসগুলো মুতাওয়াতির। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে ত্ৰিশ জনের বেশী সাহাবী এ সমস্ত হাদীস বর্ণনা করেছেন।

তবে এখানে এটা জানা আবশ্যক যে, কাউসার ও হাউয একই বস্তু নয়। হাউযের অবস্থান হাশরের মাঠে, যার পানি কাউসার থেকে সরবরাহ করা হবে। আর কাউসারের অবস্থান হোল জান্নাতে। হাশরের ময়দানে হাউয সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, জান্নাতের কাউসার ঝর্ণাধারা থেকে পানি এনে হাউযে ঢালা হবে। এক হাদীসে বলা হয়েছে, “জান্নাত থেকে দু’টি খাল কেটে এনে তাতে ফেলা হবে এবং এর সাহায্যে সেখান থেকে তাতে পানি সরবরাহ হবে।” [মুসলিম: ২৩০০, মুসনাদে আহমাদ: ৪/৪২৪, ৫/১৫৯,২৮০,২৮১,২৮২,২৮৩] সুতরাং হাউয হলো এমন এক বিরাট পানির ধারা যা আল্লাহ্ আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হাশরের মাঠে দান করেছেন। যা দুধের চেয়েও শুভ্ৰ, বরফের চেয়েও ঠাণ্ডা, মধুর চেয়েও মিষ্টি, মিসকের চেয়েও অধিক সুঘ্ৰাণ সম্পন্ন। যা অনেক প্রশস্ত, দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে সমান, তার কোণ সমূহের প্রত্যেক কোণ এক মাসের রাস্তা, তার পানির মূল উৎস হলো জান্নাত। জান্নাত থেকে এমন দু’টি নলের মাধ্যমে তার সরবরাহ কাজ সমাধা হয়ে থাকে যার একটি স্বর্ণের অপরটি রৌপ্যের। তার পেয়ালা সমূহের সংখ্যা আকাশের তারকারাজীর মত। এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আমার হাউযের আয়তন হচ্ছে ‘আইলা’ (বায়তুল মুকাদ্দাস) থেকে সান‘আ পর্যন্ত, আর সেখানে পেয়ালার সংখ্যা আকাশের তারকার মত এত বেশী”। [বুখারী: ৬৫৮০, মুসলিম: ২৩০৩] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন, “আমার হাউয এক মাসের রাস্তা, তার কোণসমূহ একই সমান, তার পানি দুধের চেয়েও সাদা, তার ঘ্রাণ মিসকের চেয়েও বেশী উত্তম, তার পেয়ালাসমূহ আকাশের তারকা মত বেশী ও উজ্জ্বল, যে তা থেকে পান করবে সে আর কখনো পিপাসার্ত হবেনা” । [বুখারী: ৬৫৭৯, মুসলিম: ২২৯২] মোটকথা: কাউসারের মূল উৎস হলো জান্নাতে। তা থেকেই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আরেকটি হাউযে পানি আসবে। সেখানে তার উম্মতকে তিনি পানি পান করাবেন। তাছাড়া সমস্ত নবীর হাউযের পানির উৎসও এ কাউসারই।

(তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া)

হারুন ইবনু আব্দুল্লাহ (রহঃ) ... আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেউ কখনো মৃত্যু কামনা করবে না। কেননা সে যদি নেককার হয় তাহলে হয়ত তার নেকী আরো পাবে। আর যদি সে বদকার হয় তাহলে হয়ত সে তাওবার দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারবে।
---সুনানু নাসাঈ শরীফ (ইফাঃ), হাদিস নং- ১৮২১।

--: যেসব স্থানে সলাত পড়া মাকরূহ :--

আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কবরস্থান ও গোসলখানা ব্যতীত সকল (পবিত্র) জায়গাই মাসজিদ।
---সুনান ইবনু মাজাহ (তাওহীদ), হাদিস নং- ৭৪৫।

তাখরীজ কুতুবুত সিত্তাহ: তিরমিযী ৩১৭, আবূ দাঊদ ৪৯২, দারিমী ১৩৯০। তাহক্বীক্ব আলবানী: সহীহ। তাখরীজ আলবানী: ইরওয়াহ ৩২০, সহীহ আবূ দাউদ ৫০৭, মিশকাত ৭৩৭।

--: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম :--

اِقۡرَاۡ بِاسۡمِ رَبِّکَ الَّذِیۡ خَلَقَ ۚ﴿۱﴾

অর্থ: পড় তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।
(সূরা আল-আলাক্ব, আয়াতঃ ১)

সূরা সম্পর্কিত তথ্যঃ

নির্ভরযোগ্য বর্ণনা থেকে প্রমাণিত রয়েছে যে, সূরা আলাক থেকেই ওহীর সূচনা হয় এবং এ সূরার প্রথম পাঁচটি আয়াত مَالَمْ يَعْلَمْ পর্যন্ত সর্ব প্রথম নাযিল হয়। [দেখুন, বুখারী: ৬৯৮২, মুসলিম: ১৬০] অধিকাংশ আলেম এ বিষয়ে একমত। কেউ কেউ সূরা আল-মুদ্দাসসিরকে প্রথম সূরা এবং কেউ সূরা ফাতেহাকে সর্বপ্রথম সূরা বলে অভিহিত করেছেন। তবে প্রথমোক্ত মতটিই বিশুদ্ধ। [আল-ইতকান ফী উলূমিল কুরআন: ১/৯৩]

--------------------------

তাফসীর: শুধু বলা হয়েছে, “সৃষ্টি করেছেন।” কাকে সৃষ্টি করেছেন তা বলা হয়নি। এ থেকে আপনা আপনিই এ অর্থ বের হয়ে আসে, সেই রবের নাম নিয়ে পড় যিনি স্রষ্টা সমগ্র বিশ্ব-জাহানের, সমগ্র সৃষ্টিজগতের। [আদ্ওয়াউল বায়ান]

(তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া)

আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সমুদ্রের পানি পবিত্র এবং তার মৃত প্রাণী হালাল।
---বুলুগুল মারাম (তাওহীদ), হাদিস নং- ১।

চারজন এ হাদীস বর্ণনা করেছেন। শব্দ বিন্যাস আবূ শাইবার, ইবনু খুযাইমাহ ও তিরমিযী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। ইমাম মালিক, শাফি’ঈ ও আহমাদ বিন হাম্বালও এটি বর্ণনা করেছেন।[1]

[আবু দাউদ ৮৩, নাসায়ী ১/৫০, ১৭৬, ৭০৭, তিরমিযী ৬৯, ইবনু মাযাহ ৩৮৬, ইবনু আবী শায়বাহ ১৩১, ইবনু খুযাইমাহ ১১১। সফওয়ান বিন সুলাইম সূত্রে; তিনি আলে বানী আযরাকে এর সাঈদ বিন সালামাহ (রাঃ) থেকে, তিনি বানী আব্দুদ দার এর মুগীরাহ বিন আবু বুরদাহ থেকে বর্ণনা করেন। তিনি আবু হুরায়রাহ (রাঃ) কে বলতে শুনেছেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা সমুদ্রে বিচরণ করি, আর আমাদের সাথে অল্প পরিমাণ পানি নিয়ে যাই, ফলে আমরা যদি এই পানি দিয়ে অযূ করি তাহলে আমাদের খাবার পানির পিপাসায় ভোগার আশংকা রয়েছে। সুতরাং আমরা কি সমুদ্রের পানি দিয়ে অযূ করতে পারি? অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ উক্তি করেন। ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন। মুহাক্কিক সুমাইর আয-যুহাইরি বুলুগুল মারামের ব্যাখ্যা গ্রন্থে বলেন, এই সনদ সহীহ । কেউ আবার এতে ক্ৰটি আছে বলে মন্তব্য করলেও তাতে কোন ক্ষতি নেই, কেননা হাদীসটির কয়েকটি শাহেদ (সমর্থক) হাদীস রয়েছে। ]

--: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম :--

ثُمَّ السَّبِيلَ يَسَّرَهُۥ

অর্থ: তারপর তার জন্য পথ সহজ করে দেন ;
(সূরা আবাসা, আয়াতঃ ২০)

তাফসীর: অর্থাৎ আল্লাহ্ তা‘আলা স্বীয় ক্ষমতা-বলে মাতৃগর্ভে মানুষকে সৃষ্টি করেন। তারপর তিনিই তার অপার শক্তির মাধ্যমে মাতৃগৰ্ভ থেকে জীবিত ও পুর্ণাঙ্গ মানুষের বাইরে আসার পথ সহজ করে দেয়। ফলে দেহটি সহী-সালামতে বাইরে চলে আসে এবং মায়েরও এতে তেমন কোন দৈহিক ক্ষতি হয় না। এছাড়া আয়াতের আরেকটি অর্থ হচ্ছে, দুনিয়ায় তিনি তার জন্য নিজের জন্য ভালো বা মন্দ, কৃতজ্ঞতা বা অকৃতজ্ঞতা আনুগত্য বা অবাধ্যতার মধ্যে সে কোন পথ চায় তা তার সামনে খুলে রেখে দিয়েছেন এবং পথ তার জন্য সহজ করে দিয়েছেন। ফলে সে শুকরিয়া আদায় করে সৎপথ গ্রহণ করতে পারে, আবার কুফরী করে বিপথে যেতে পারে। [দেখুন, ইবন কাসীর]

(তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া)

মু‘আয ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনু খুবাইব (রহঃ) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক বর্ষণমুখর খুবই অন্ধকার কালো রাতে আমাদের সালাত পড়ার জন্য আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে খুঁজছিলাম। আমরা তাঁকে পেয়ে গেলাম। তিনি বললেনঃ বলো। আমি কিছুই বললাম না। পুনরায় তিনি বললেন, বলো। আমি কিছুই বললাম না। তিনি আবার বললেনঃ বলো। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! কি বলবো? তিনি বললেনঃ তুমি সন্ধ্যায় ও সকালে উপনীত হয়ে তিনবার সূরা কুল হুয়াল্লাহু (সূরা ইখলাস), সূরা নাস ও ফালাক পড়বে; এতে তুমি যাবতীয় অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাবে।
---সুনান আবু দাঊদ (আল্লামা আলবানী একাডেমী), হাদিস নং- ৫০৮২।

--: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম :--

وَ لَسَوۡفَ یَرۡضٰی ﴿٪۲۱﴾

অর্থ: আর অচিরেই সে সন্তোষ লাভ করবে।
(সূরা আল-লাইল, আয়াতঃ ২১)

তাফসীর: বলা হয়েছে, শীঘ্রই আল্লাহ্ এ ব্যক্তিকে এত-কিছু দেবেন যার ফলে সে খুশী হয়ে যাবে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি কেবলমাত্র আল্লাহ্র সস্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যেই দুনিয়াতে তার ধনসম্পদ ব্যয় করেছে এবং কষ্ট করেছে, আল্লাহ্ তা‘আলাও আখেরাতে তাকে সন্তুষ্ট করবেন এবং জান্নাতের মহা নেয়ামত তাকে দান করবেন। [তাবারী] এই শেষ বাক্যটি মুত্তাকীদের জন্য, বিশেষ করে আবুবকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু-এর জন্যে একটি বিরাট সুসংবাদ। আল্লাহ্ তাকে সন্তুষ্ট করবেন-এ সংবাদ এখানে তাকে শোনানো হয়েছে। [আদ্ওয়াউল বায়ান]

(তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া)

--: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম :--

فَلۡیَعۡبُدُوۡا رَبَّ ہٰذَا الۡبَیۡتِ ۙ﴿۳﴾

অর্থ: অতএব তারা যেন এ গৃহের রবের ‘ইবাদাত করে,
(সূরা কুরাইশ, আয়াতঃ ৩)

তাফসীর: ‘এ ঘর’ অর্থ কা‘বা শরীফ । বলা হয়েছে, এ ঘরের রব –এর ইবাদত কর। এখানে ঘরটিকে আল্লাহ্র সাথে সম্পর্কযুক্ত করার মাধ্যমে ঘরকে সম্মানিত করাই উদ্দেশ্য। [সা’দী] আর এই গৃহই যেহেতু তাদের সব শ্রেষ্ঠত্ব ও কল্যাণের উৎস ছিল, তাই বিশেষভাবে এই গৃহের মৌলিক গুণটি উল্লেখ করা হয়েছে। আর তা হচ্ছে, এটি মহান রবের ঘর। অর্থাৎ এ ঘরের বদৌলতেই কুরাইশরা এই নিয়ামতের অধিকারী হয়েছে। একমাত্র আল্লাহ্ই যার রব। তিনিই আসহাবে ফীলের আক্রমণ থেকে তাদেরকে বাঁচিয়েছেন। আবরাহার সেনাবাহিনীর মোকাবিলায় সাহায্য করার জন্য তাঁর কাছেই তারা আবেদন জানিয়েছিল। তাঁর ঘরের আশ্রয় লাভ করার আগে যখন তারা আরবের চারদিকে ছড়িয়ে ছিল তখন তাদের কোন মর্যাদাই ছিল না। আরবের অন্যান্য গোত্রের ন্যায় তারাও একটি বংশধারার বিক্ষিপ্ত দল ছিল মাত্র। কিন্তু মক্কায় এই ঘরের চারদিকে একত্র হবার এবং এর সেবকের দায়িত্ব পালন করতে থাকার পর সমগ্র আরবে তারা মর্যাদাশালী হয়ে উঠেছে। সবদিকে তাদের বাণিজ্য কাফেলা নিৰ্ভয়ে যাওয়া আসা করছে। তারা যা কিছুই লাভ করেছে এ ঘরের রবের বদৌলতেই লাভ করেছে। কাজেই তাদের একমাত্র সেই রবেরই ইবাদত করা উচিত। [দেখুন: মুয়াসসার, কুরতুবী]

(তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া)

আহমদ ইবন ইবরাহীম (রহঃ) ..... মা‘কাল ইবন ইয়াসার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে বলে, আমি এক সুন্দরী এবং সদ্বংশীয়া রমনীর সন্ধান পেয়েছি, কিন্তু সে কোন সন্তান প্রসব করে না (বন্ধ্যা)। আমি কি তাকে বিবাহ করব? তিনি বলেন, না। অতঃপর সে ব্যক্তি দ্বিতীয়বার এসে জিজ্ঞাসা করলে তিনি তাকে নিষেধ করেন। পরে তৃতীয়বার সে ব্যক্তি এলে তিনি বলেন, তোমরা এমন স্ত্রীলোকদের বিবাহ করবে, যারা স্বামীদের অধিক মহাব্বাত করে এবং অধিক সন্তান প্রসব করে। কেননা আমি (কিয়ামতের দিন) তোমাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে (পূর্ববর্তী উম্মতের উপর) গর্ব প্রকাশ করব।
---আবূ দাঊদ শরীফ (ইফাঃ), হাদিস নং- ২০৪৬।

--: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম :--

اَلَمۡ تَرَ کَیۡفَ فَعَلَ رَبُّکَ بِاَصۡحٰبِ الۡفِیۡلِ ؕ﴿۱﴾

অর্থ: তুমি কি দেখনি তোমার রব হাতীওয়ালাদের সাথে কী করেছিলেন?
(সূরা আল-ফীল, আয়াতঃ ১)

সূরা সম্পর্কিত তথ্যঃ

এ সূরায় হস্তীবাহিনীর ঘটনা সংক্ষেপে বৰ্ণিত হয়েছে। তারা কাবা গৃহকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে হস্তীবাহিনী নিয়ে মক্কায় অভিযান পরিচালনা করেছিল। আল্লাহ তা‘আলা নগণ্য পক্ষীকুলের মাধ্যমে তাদের বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করে তাদের কুমতলবকে ধূলায় মিশিয়ে দেন। মক্কা মুকাররমায় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মের বছর হস্তীবাহিনীর ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। হাদীসবিদগণ এ ঘটনাকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এক প্রকার নবুওয়াতের ভূমিকাস্বরূপ সাব্যস্ত করেছেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওয়ত এমনকি জন্মেরও পূর্বে এ ধরনের আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল। হস্তী-বাহিনীকে আসমানী আযাব দ্বারা প্রতিহত করাও এসবের অন্যতম।

-------------------------------

তাফসীর: এখানে ألم تر ‘আপনি কি দেখেননি’ বলা হয়েছে। বাহ্যত এর দ্বারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করা হয়েছে, অথচ এটা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্মের কিছু দিন পূর্বেকার ঘটনা। কোন কোন মুফাসসির এর সমাধানে বলেন, এখানে শুধু কুরাইশদেরকেই নয় বরং সমগ্র আরববাসীকেই সম্বোধন করা হয়েছে। তারা এই সমগ্র ঘটনা সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত ছিল। কুরআন মজিদের বহু স্থানে ‘আলাম তারা’ বা আপনি কি দেখেননি? শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নয় বরং সাধারণ লোকদেরকে সম্বোধন করাই উদ্দেশ্য। [কুরতুবী] অপর কোন কোন তাফসিরবিদ বলেন, যে ঘটনা এরূপ নিশ্চিত যে, তা ব্যাপকভাবে প্রত্যক্ষ করা হয়, সে ঘটনার জ্ঞানকেও দেখা বলে ব্যক্ত করা হয়; যেন এটা চাক্ষূষ ঘটনা। তাছাড়া, এক পর্যায়ে দেখাও প্রমাণিত আছে; যেমন কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, আয়েশা ও আসমা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা দুজন হস্তীচালককে অন্ধ, বিকলাঙ্গ ও ভিক্ষুকরূপে দেখেছিলেন। [বাইহাকী: দালায়েলুন নাবুওয়াহ, ১/৫২] [আত-তাহরীর ওয়াত-তানওয়ীর]

(তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া)

মুসাদ্দাদ (রহঃ) ...... আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ (সাধারণ) রমণীদেরকে চারটি গুণের অধিকারী দেখে বিবাহ করা হয়। যথাঃ (ক) তার ধন-সম্পদ, (খ) বংশমর্যাদা, (গ) তার সৌন্দর্য, (ঘ) তার দ্বীনদারী। তোমরা দ্বীনদার নারীকে বিবাহ করে ধন্য হও, অন্যথায় তোমার উভয় হাত অবশ্যই ধুলায় ধূসরিত হবে। (অর্থাৎ তুমি লাঞ্জিত ও অপমানিত হবে। হাদীসে ধর্মপরায়ণা নারীকে প্রাধান্য দিতে বলা হয়েছে।)।
---আবূ দাঊদ শরীফ (ইফাঃ), হাদিস নং- ২০৪৩।

--: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম :--

یَوۡمَ یَکُوۡنُ النَّاسُ کَالۡفَرَاشِ الۡمَبۡثُوۡثِ ۙ﴿۴﴾

যেদিন মানুষ হবে বিক্ষিপ্ত পতঙ্গের মত,
(সূরা আল-ক্বারি'আহ, আয়াতঃ ৪)

তাফসীর: অর্থাৎ মানুষ সেদিনের অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের বিক্ষিপ্ততা, আনা-গোনা ইত্যাদিতে উদ্ভ্রান্তের মত থাকবে। মনে হবে যেন তারা বিক্ষিপ্ত পতঙ্গ। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “মনে হবে যেন তারা বিক্ষিপ্ত পঙ্গপাল”। [সূরা আল-কামারঃ ৭] আগুন জ্বালানোর পর পতংগ যেমন দিক-বিদিক থেকে হন্য হয়ে আগুনের দিকে ছুটে আসে সেদিন মানুষ তেমনিভাবে হাশরের মাঠের দিকে ছুটে আসবে। [ইবন কাসীর, কুরতুবী]

(তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া)

আমর ইব্‌ন আওন (রহঃ) ...... আল-মুনযির ইবন জারীর (রহঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি বাওযীজ নামক স্থানে জারীর (রাঃ) এর সাথে ছিলাম। রাখাল গরুর পালসহ উপস্থিত হলে তার মধ্যে বাইরের একটি গরুও ছিল। জারীর (রাঃ) তাকে জিজ্ঞাসা করেন, এটা কোথা থেকে এলো? রাখাল বলল, আমাদের গরুর সাথে এসে যোগ দিয়েছে, কে তার মালিক জানিনা। জারীর (রাঃ) বলেন, পাল থেকে এটা বের করে দাও। আমি রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছিঃ পথভ্রষ্ট ব্যক্তিই হারানো পশুকে আশ্রয় দেয়।
---আবু দাঊদ শরীফ (ইফাঃ), হাদিস নং- ১৭২০।

--: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম :--

اِنَّ الۡاِنۡسَانَ لِرَبِّہٖ لَکَنُوۡدٌ ۚ﴿۶﴾

অর্থ: নিশ্চয় মানুষ তার রবের প্রতি বড়ই অকৃতজ্ঞ।
(সূরা আল-আদিয়াত, আয়াতঃ ৬)

তাফসীর: এত বড় শপথ করার পরে এখানে যে উদ্দেশ্যে শপথ করা হয়েছে : তা বর্ণনা করা হয়েছে। শপথের মূলকথা হচ্ছে এটা বৰ্ণনা করা যে, মানুষ তার প্রভুর অকৃতজ্ঞতাই প্রকাশ করে থাকে। كنود বলতে এখানে মূলত বোঝানো হয়েছে যে, মানুষ তার রবের নেয়ামতের প্রতি বড়ই অকৃতজ্ঞ। হাসান বসরী বলেন, كنود এর অর্থ সে ব্যক্তি, যে বিপদ স্মরণ রাখে এবং নেয়ামত ভুলে যায়। [ইবন কাসীর]

(তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া)

মাখলাদ ইব্‌ন খালিদ (রঃ) ...... আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হারানো প্রাপ্ত উটের হুকুম হল, যদি কেঊ তা প্রাপ্তির পর গোপন করে তবে তাকে জারিমানাস্বরূপ ঐ উটের সাথে অনুরূপ আরো একটি উট প্রদান করতে হবে।
---আবু দাঊদ শরীফ (ইফাঃ), হাদিস নং- ১৭১৮।

--: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম :--

یَوۡمَئِذٍ یَّصۡدُرُ النَّاسُ اَشۡتَاتًا ۬ۙ لِّیُرَوۡا اَعۡمَالَہُمۡ ؕ﴿۶﴾

অর্থ: সেদিন মানুষ বিক্ষিপ্তভাবে বের হয়ে আসবে যাতে দেখানো যায় তাদেরকে তাদের নিজদের কৃতকর্ম।
(সূরা আল-যিলযাল, আয়াতঃ ৬)

তাফসীর: এর অর্থ, মানুষ সেদিন হাশরের মাঠ থেকে তাদের আমল অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে যাবে; তাদের কেউ জান্নাতে যাবে, কেউ যাবে জাহান্নামে। [জালালাইন, মুয়াসসার, সা‘দী] এর দ্বিতীয় অর্থ হতে পারে, বিগত হাজার হাজার বছরে সমস্ত মানুষ যে যেখানে মরেছিল সেখান থেকে অর্থাৎ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে থেকে দলে দলে চলে আসতে থাকবে। যেমন অন্যত্র বলা হয়েছে, “যে দিন শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে, তোমরা দলে দলে এসে যাবে। [সূরা আন-নাবা: ১৮] [ফাতহুল কাদীর]

অর্থাৎ তাদের আমল তাদেরকে দেখানো হবে। প্রত্যেকে দুনিয়ায় কি কাজ করে এসেছে তা তাকে বলা হবে। কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে একথা সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, কাফের মুমিন, সৎকর্মশীল ও ফাসেক, আল্লাহ্র হুকুমের অনুগত ও নাফরমান সবাইকে অবশ্যি তাদের আমলনামা দেয়া হবে। [দেখুন, সূরা আল-হাক্কার ১৯ ও ২৫, সূরা আল-ইনশিকাকের ৭-১০]

(তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া)

ইয়াকূব ইবনু ইবরাহীম (রহঃ) ... আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যেন বদ্ধ পানিতে পেশাব না করে, যাতে সে পরে গোসল করবে। ইমাম নাসাঈ (রহঃ) বলেনঃ ইয়াকূব (রহঃ) এ হাদীসখানা বর্ণনা করতেন এক দ্বীনার দিয়ে।
---সুনানু নাসাঈ শরীফ (ইফাঃ), হাদিস নং- ৫৮।

সহীহ, প্রাগুক্ত, বুখারী হাঃ ২৩৯, মুসলিম (ইসলামিক সেন্টার) হাঃ ৫৬৩।

--: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম :--

اِقۡرَاۡ بِاسۡمِ رَبِّکَ الَّذِیۡ خَلَقَ ۚ﴿۱﴾

অর্থ: পড় তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।
(সূরা আল-আলাক্ব, আয়াতঃ ১)

সূরা সম্পর্কিত তথ্যঃ

নির্ভরযোগ্য বর্ণনা থেকে প্রমাণিত রয়েছে যে, সূরা আলাক থেকেই ওহীর সূচনা হয় এবং এ সূরার প্রথম পাঁচটি আয়াত مَالَمْ يَعْلَمْ পর্যন্ত সর্ব প্রথম নাযিল হয়। [দেখুন, বুখারী: ৬৯৮২, মুসলিম: ১৬০] অধিকাংশ আলেম এ বিষয়ে একমত। কেউ কেউ সূরা আল-মুদ্দাসসিরকে প্রথম সূরা এবং কেউ সূরা ফাতেহাকে সর্বপ্রথম সূরা বলে অভিহিত করেছেন। তবে প্রথমোক্ত মতটিই বিশুদ্ধ। [আল-ইতকান ফী উলূমিল কুরআন: ১/৯৩]

--------------------------

তাফসীর: শুধু বলা হয়েছে, “সৃষ্টি করেছেন।” কাকে সৃষ্টি করেছেন তা বলা হয়নি। এ থেকে আপনা আপনিই এ অর্থ বের হয়ে আসে, সেই রবের নাম নিয়ে পড় যিনি স্রষ্টা সমগ্র বিশ্ব-জাহানের, সমগ্র সৃষ্টিজগতের। [আদ্ওয়াউল বায়ান]

(তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া)

--: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম :--

وَ مَا لِاَحَدٍ عِنۡدَہٗ مِنۡ نِّعۡمَۃٍ تُجۡزٰۤی ﴿ۙ۱۹﴾

আর তার প্রতি কারো এমন কোন অনুগ্রহ নেই, যার প্রতিদান দিতে হবে।
(সূরা আল-লাইল, আয়াতঃ ১৯)

তাফসীর: এখানে সেই মুত্তাকী ব্যক্তির আরো বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে। সে যে নিজের অর্থ যাদের জন্য ব্যয় করে, আগে থেকেই তার কোন অনুগ্রহ তার ওপর ছিল না, যার প্রতিদান বা পুরস্কার দিচ্ছে অথবা ভবিষ্যতে তাদের থেকে কোন স্বাৰ্থ উদ্ধারের অপেক্ষায় তাদেরকে উপহার-উপঢৌকন ইত্যাদি দিয়ে ব্যয় করছে; বরং সে নিজের মহান ও সর্বশক্তিমান রবের সস্তুষ্টি লাভের জন্যই এমন-সব লোককে সাহায্য করছে, যারা ইতোপূর্বে তার কোন উপকার করেনি এবং ভবিষ্যতেও তাদের উপকার পাওয়ার আশা নেই। [তাবারী] বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে, এ আয়াতটি আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর শানে নাযিল হয়েছে। [মুসনাদে বাযযার (আল-বাহরুয, যাখখার) : ৬/১৬৮, ২২০৯] আবু বকর সিদীক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু মক্কা মু‘আযযমার যে অসহায় গোলাম ও বাঁদীরা ইসলাম গ্ৰহণ করেছিলেন এবং এই অপরাধে তাদের মালিকরা তাদের ওপর চরম অকথ্য নির্যাতন ও নিপীড়ন চালাচ্ছিল তাদেরকে মালিকদের যুলুম থেকে বাঁচাবার জন্য কিনে নিয়ে আযাদ করে দিচ্ছিলেন। যেসব দাসকে আবুবকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু প্রচুর অর্থ দিয়ে ক্রয় করে মুক্ত করে দেন, তাদের কোন সাবেক অনুগ্রহও তাঁর উপর ছিল না, যার প্রতিদানে এরূপ করা যেত; বরং তার লক্ষ্য মহান আল্লাহ্ তা‘আলার সস্তুষ্টি অন্বেষণ ব্যতীত কিছুই ছিল না। এ ধরনের মুসলিম সাধারণ দুর্বল ও শক্তিহীন হত। একদিন তার পিতা আবু কোহাফা বললেন: তুমি যখন গোলামদেরকে মুক্তই করে দাও, তখন শক্তিশালী ও সাহসী গোলাম দেখেই মুক্ত করো, যাতে ভবিষ্যতে সে শত্রুর হাত থেকে তোমাকে রক্ষা করতে পারে। আবুবকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন: কোন মুক্ত-করা মুসলিম থেকে উপকার লাভ করা আমার লক্ষ্য নয়। আমি তো কেবল আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের জন্যেই তাদেরকে মুক্ত করি। [মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/৫৭২, নং ৩৯৪২]

(তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া)

কুররাহ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার উম্মাতের একটি দল অব্যাহতভাবে ক্বিয়ামাত পর্যন্ত সাহায্যপ্রাপ্ত হতে থাকবে এবং যারা তাদের অপদস্থ করতে চায় তারা তাদের কোন ক্ষতি করতে সক্ষম হবে না।
---সুনান ইবনু মাজাহ (তাওহীদ), হাদিস নং- ৬।

[তাখরীজ কুতুবুত সিত্তাহ: তিরমিযী ২১৯২, আহমাদ ১৫১৬৯, ১৯৮৫৪। তাহক্বীক্ব আলবানীঃ সহীহ। তাখরীজ আলবানীঃ সহীহা ১/৩/১৩৫ ]

--: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম :--

لَیۡسَ لَہُمۡ طَعَامٌ اِلَّا مِنۡ ضَرِیۡعٍ ۙ﴿۶﴾

অর্থ: তাদের জন্য কাঁটাবিশিষ্ট গুল্ম ছাড়া কোন খাদ্য থাকবে না।
(সূরা আল-গাশিয়াহ, আয়াতঃ ৬)
তাফসীর: ضَرِيْعٌ শব্দের অর্থ করা হয়েছে, কাঁটাযুক্ত গুল্ম। অর্থাৎ জাহান্নামীরা কোন খাদ্য পাবে না কেবল এক প্রকার কণ্টকবিশিষ্ট ঘাস। পৃথিবীর মাটিতে এ ধরনের গুল্ম ছড়ায়। দুৰ্গন্ধযুক্ত বিষাক্ত কাঁটার কারণে জন্তু-জানোয়ার এর ধারে কাছেও যায় না। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত যে, ضَرِيْعٌ হচ্ছে জাহান্নামের একটি গাছ। যা খেয়ে কেউ মোটা তাজা হবে না এবং এতে ক্ষুধা থেকেও মুক্তি পাওয়া যাবে না। [ফাতহুল কাদীর]

লক্ষণীয় যে, কুরআন মজীদে কোথাও বলা হয়েছে, জাহান্নামের অধিবাসীদের খাবার জন্য “যাককুম” দেয়া হবে। কোথাও বলা হয়েছে, “গিসলীন” (ক্ষতস্থান থেকে ঝরে পড়া তরল পদার্থ) ছাড়া তাদের আর কোন খাবার থাকবে না। আর এখানে বলা হচ্ছে, তারা খাবার জন্য কাঁটাওয়ালা শুকনো ঘাস ছাড়া আর কিছুই পাবে না। এ বর্ণনাগুলোর মধ্যে মূলত কোন বৈপরীত্য নেই। এর অর্থ এও হতে পারে যে, জাহান্নামের অনেকগুলো পর্যায় থাকবে। বিভিন্ন অপরাধীকে তাদের অপরাধ অনুযায়ী সেই সব পর্যায়ে রাখা হবে। তাদেরকে বিভিন্ন ধরনের আযাব দেয়া হবে। আবার এর অর্থ এও হতে পারে যে, তারা “যাককুম” খেতে না চাইলে “গিসলীন” পাবে এবং তা খেতে অস্বীকার করলে কাঁটাওয়ালা ঘাস ছাড়া আর কিছুই পাবে না। মোটকথা, তারা কোন মনের মতো খাবার পাবে না। [কুরতুবী]

(তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া)

আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) ... আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) মসজিদে নববীর দরজার নিকটে এক জোড়া রেশমী পোষাক (বিক্রি হতে) দেখে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! যদি এটি আপনি খরীদ করতেন আর জুম্মার দিন এবং যখন আপনার কাছে প্রতিনিধি দল আসে তখন আপনি তা পরিধান করতেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এটি তো সে ব্যাক্তই পরিধান করে, আখিরাতে যার (মঙ্গলের) কোন অংশ নেই।

এর পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এ ধরণের কয়েক জোড়া পোশাক আসে, তখন তার এক জোড়া তিনি উমর (রাঃ)-কে প্রদান করেন। উমর (রাঃ) আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আমাকে এটি পরিধান করতে দিলেন অথচ আপনি উতারিদের (রেশম) পোশাক সম্পর্কে যা বলার তা তো বলেছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমি তোমাকে এটি নিজের পরিধানের জন্য প্রদান করিনি। উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) তখন এটি মক্কায় তাঁর এক ভাইকে দিয়ে দেন, যে তখন মুশরিক ছিল।

---বুখারী শরীফ (ইফাঃ), হাদিস নং- ৮৪২।

--: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম :--

إِنَّ الَّذِينَ فَتَنُوا الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنٰتِ ثُمَّ لَمْ يَتُوبُوا فَلَهُمْ عَذَابُ جَهَنَّمَ وَلَهُمْ عَذَابُ الْحَرِيقِ

অর্থ: নিশ্চয় যারা মুমিন নরনারীকে বিপদাপন্ন করেছে তারপর তাওবা করেনি তাদের জন্য আছে জাহান্নামের শাস্তি, আর তাদের জন্য আছে দহন যন্ত্রণা।
(সূরা আল-বুরুজ, আয়াতঃ ১০)

তাফসীর: فتنوا শব্দের এক অর্থ হচ্ছে, أحرقوا বা জ্বালিয়েছিল। অপর অর্থ পরীক্ষা করা। বিপদে ফেলা। [ফাতহুল কাদীর]

কাফেরদের জাহান্নামের আযাব ও দহন যন্ত্রণার খবর দেয়ার সাথে সাথে কুরআন বলছে যে, এই আযাব তাদের ওপর পতিত হবে, যারা এই দুষ্কর্মের কারণে অনুতপ্ত হয়ে তওবা করেনি। এতে তাদেরকে তাওবার দাওয়াত দেয়া হয়েছে। হাসান বসরী বলেন: বাস্তবিকই আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও কৃপার কোন তুলনা নেই। তারা তো আল্লাহ্র নেক বান্দাদেরকে জীবিত দগ্ধ করে তামাশা দেখছে, আল্লাহ্ তা‘আলা এরপরও তাদেরকে তওবা ও মাগফিরাতের দাওয়াত দিচ্ছেন। [ইবনুল কাইয়্যেম, বাদায়ে‘উস তাফসীর; ইবন কাসীর]

এখানে অত্যাচারী কাফেরদের শাস্তি বর্ণিত হয়েছে, যারা মুমিনদেরকে কেবল ঈমানের কারণে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করেছিল। শাস্তি প্রসঙ্গে দুটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে- (এক) তাদের জন্যে আখেরাতে জাহান্নামের আযাব রয়েছে, (দুই) তাদের জন্যে দহন যন্ত্রণা রয়েছে। এখানে দ্বিতীয়টি প্রথমটিরই বর্ণনা ও তাকীদ হতে পারে। অর্থাৎ জাহান্নামে গিয়ে তারা চিরকাল দহন যন্ত্রণা ভোগ করবে। এটাও সম্ভবপর যে, দ্বিতীয় বাক্যে দুনিয়ার শাস্তি বর্ণিত হয়েছে। প্রখ্যাত আলেম রবী ইবনে আনাস বলেন, মুমিনদেরকে অগ্নিতে নিক্ষেপ করার পর অগ্নি স্পর্শ করার পূর্বেই আল্লাহ্ তা'আলা তাদের রূহ্ কবজ করে নেন। এভাবে তিনি তাদেরকে দহন যন্ত্রণা থেকে রক্ষা করেন। ফলে তাদের মৃতদেহই কেবল অগ্নিতে দগ্ধ হয়। অতঃপর এই অগ্নি আরও বেশি প্রজ্বলিত হয়ে তার লেলিহান শিখা শহরে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে যারা মুসলিমদের অগ্নি দগ্ধ হওয়ার তামাশা দেখছিল, তারাও এই আগুনে পুড়ে ভস্ম হয়ে যায়। [ফাতহুল কাদীর]

(তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া)

--: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম :--

يٰٓأَيُّهَا الْإِنسٰنُ إِنَّكَ كَادِحٌ إِلٰى رَبِّكَ كَدْحًا فَمُلٰقِيهِ

অর্থ: হে মানুষ! তুমি তোমার রবের কাছে পৌছা পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করতে হবে, অতঃপর তুমি তাঁর সাক্ষাত লাভ করবে।
(সূরা আল-ইনশিক্বাক্ব, আয়াতঃ ৬)

তাফসীর: كدح এর অর্থ কোন কাজে পূর্ণ চেষ্টা ও শক্তি ব্যয় করা। [ফাতহুল কাদীর] মানুষের প্রত্যেক চেষ্টা ও অধ্যবসায় আল্লাহ্র দিকে চূড়ান্ত হবে। অর্থাৎ মানুষ দুনিয়ায় যা কিছু কষ্ট-সাধনা প্ৰচেষ্টা ও সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে সে সম্পর্কে সে মনে করতে পারে যে তা কেবল দুনিয়ার জীবন পর্যন্তই সীমাবদ্ধ এবং দুনিয়াবী স্বাৰ্থ লাভ করাই এর উদ্দেশ্য। কিন্তু আসলে সে সচেতন বা অচেতনভাবে নিজের রবের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে এবং অবশেষে তাকে তাঁর কাছেই পৌঁছতে হবে। মানুষ এখানে যে চেষ্টা-চরিত্র করছে, পরিশেষে তার পালনকর্তার কাছে পৌছে এর সাথে তার সাক্ষাৎ ঘটবে এবং এর শুভ অথবা অশুভ পরিণতি সামনে এসে যাবে। অথবা এর অর্থ প্রত্যেক মানুষ আখেরাতে তার পালনকর্তার সাথে সাক্ষাৎ করবে এবং হিসাবের জন্যে তাঁর সামনে উপস্থিত হবে। [দেখুন, কুরতুবী] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সাক্ষাত করতে চায়, আল্লাহ্ও তার সাক্ষাত করতে পছন্দ করেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সাক্ষাত করতে চায় না, আল্লাহ্ও তার সাথে সাক্ষাত করতে অপছন্দ করেন।’ আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা-অথবা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্য কোন স্ত্রী- বলেন, ‘আমরা তো মৃত্যুকে অপছন্দ করি।’ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘তা নয়। কিন্তু মুমিন ব্যক্তির যখন মৃত্যু ঘণিয়ে আসে, তখন তাকে আল্লাহ্ তা'আলার সস্তুষ্টি ও সম্মানের সুসংবাদ দেওয়া হয়। তখন তার কাছে মৃত্যু অপেক্ষা অন্য কিছু প্রিয় হতে পারে না। এভাবে সে আল্লাহ্র সাক্ষাত করতে পছন্দ করে, তাই আল্লাহ্ তা‘আলাও তার সাথে সাক্ষাত করতে পছন্দ করেন। আর কাফির ব্যক্তিকে মৃত্যুর সময় আল্লাহ্র আযাব ও শাস্তির সংবাদ দেওয়া হয়, তখন মৃত্যু অপেক্ষা অপ্রিয় আর কিছু থাকে না। সে আল্লাহ্র সাক্ষাত অপছন্দ করে বিধায় আল্লাহ্ তা'আলা তার সাথে সাক্ষাত অপছ ন্দকরেন’। [বুখারী: ৬৫০৭, মুসলিম: ২৬৮৩]

(তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া)

--: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম :--

وَيْلٌ لِّلْمُطَفِّفِينَ

অর্থ: দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়,
(সূরা আল-মুতাফফিফীন, আয়াতঃ ১)

সূরা সংক্রান্ত আলোচনাঃ

বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ্র সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মদীনায় তশরীফ আনেন, তখন মদীনাবাসীদের সাধারণ কাজ কারবার ‘কাইল’ তথা মাপের মাধ্যমে সম্পন্ন হত। তারা এ ব্যাপারে চুরি করা ও কম মাপায় খুবই অভ্যস্ত ছিল। এর প্রেক্ষিতে সূরা আল-মুতাফফেফীন নাযিল হয়। এই সূরা নাযিল হওয়ার পর তারা এই বদ-আভ্যাস থেকে বিরত হয় এবং এমন বিরত হয় যে, আজ পর্যন্ত তাদের সুখ্যাতি সৰ্বজনবিদিত। [নাসায়ী: আস-সুনানুল কুবরা: ১১৫৯০, ইবনে মাজহ: ২২২৩]

______________________

তাফসীর: تَطْفِيْفٌ এর অর্থ মাপে কম করা। যে এরূপ করে তাকে বলা হয় مُطَفِّف। [কুরতুবী] কুরআনের এই আয়াত ও বিভিন্ন হাদীসে মাপ ও ওজনে কম করাকে হারাম করা হয়েছে এবং সঠিকভাবে ওজন ও পরিমাপ করার জন্য কড়া তাগিদ করা হয়েছে। যেমন বলা হয়েছেঃ “ইনসাফ সহকারে পুরো ওজন ও পরিমাপ করো। আমি কাউকে তার সামর্থের চাইতে বেশীর জন্য দায়িত্বশীল করি না।” [সূরা আল-আন‘আমঃ ১৫২] আরও বলা হয়েছেঃ “মাপার সময় পুরো মাপবে এবং সঠিক পাল্লা দিয়ে ওজন করবে।” [সূরা আল-ইসরা: ৩৫] অন্যত্র তাকীদ করা হয়েছে: “ওজনে বাড়াবাড়ি করো না, ঠিক ঠিকভাবে ইনসাফের সাথে ওজন করো এবং পাল্লায় কম করে দিয়ো না। [সূরা আর-রহমান: ৮-৯)। শু‘আইব আলাইহিস্ সালামের সম্প্রদায়ের ওপর এ অপরাধের কারণে আযাব নাযিল হয় যে, তাদের মধ্যে ওজনে ও মাপে কম দেওয়ার রোগ সাধারণভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং শু'আইব আলাইহিস্ সালাম এর বারবার নসীহত করা সত্ত্বেও এ সম্প্রদায়টি এ অপরাধমূলক কাজটি থেকে বিরত থাকেনি। তবে আয়াতে উল্লেখিত تطفيف শুধু মাপ ও ওজনের মধ্যেই সীমিত থাকবে না; বরং মাপ ও ওজনের মাধ্যমে হোক, গণনার মাধ্যমে হোক অথবা অন্য কোন পন্থায় প্রাপককে তার প্রাপ্য কম দিলে তা تطفيف এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে হারাম হবে। সুতরাং প্রত্যেক প্রাপকের প্রাপ্য পূর্ণমাত্রায় দেয়াই যে আয়াতের উদ্দেশ্য এ কথা বলাই বাহুল্য। উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু জনৈক ব্যক্তিকে আসরের সালাতে না দেখে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন। সে একটি ওজর পেশ করল। তখন তিনি তাকে বললেন, طفَّفت অর্থাৎ ‘তুমি আল্লাহ্র প্রাপ্য আদায়ে কমতি করেছ।’ এই উক্তি উদ্ধৃত করে ইমাম মালেক রাহেমাহুল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক বস্তুর মধ্যে পূর্ণমাত্রায় দেয়া ও কম করা আছে [মুয়াত্তা মালেক: ১/১২, নং ২২] । তাছাড়া ঝগড়া-বিবাদের সময় নিজের দলীল-প্রমাণাদি পেশ করার পর প্রতিপক্ষের দলীল-প্রমাণাদি পেশ করার সুযোগ দেয়াও এর অন্তর্ভুক্ত। [সা‘দী]

(তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া)

--: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম :--

ثُمَّ السَّبِيلَ يَسَّرَهُۥ

অর্থ: তারপর তার জন্য পথ সহজ করে দেন ;
(সূরা আবাসা, আয়াতঃ ২০)

তাফসীর: অর্থাৎ আল্লাহ্ তা‘আলা স্বীয় ক্ষমতা-বলে মাতৃগর্ভে মানুষকে সৃষ্টি করেন। তারপর তিনিই তার অপার শক্তির মাধ্যমে মাতৃগৰ্ভ থেকে জীবিত ও পুর্ণাঙ্গ মানুষের বাইরে আসার পথ সহজ করে দেয়। ফলে দেহটি সহী-সালামতে বাইরে চলে আসে এবং মায়েরও এতে তেমন কোন দৈহিক ক্ষতি হয় না। এছাড়া আয়াতের আরেকটি অর্থ হচ্ছে, দুনিয়ায় তিনি তার জন্য নিজের জন্য ভালো বা মন্দ, কৃতজ্ঞতা বা অকৃতজ্ঞতা আনুগত্য বা অবাধ্যতার মধ্যে সে কোন পথ চায় তা তার সামনে খুলে রেখে দিয়েছেন এবং পথ তার জন্য সহজ করে দিয়েছেন। ফলে সে শুকরিয়া আদায় করে সৎপথ গ্রহণ করতে পারে, আবার কুফরী করে বিপথে যেতে পারে। [দেখুন, ইবন কাসীর]

(তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া)

আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন দিনের উত্তাপ খুব বেড়ে যাবে তখন উত্তাপ কমে (আবহাওয়া) ঠাণ্ডা হলে (যুহরের) সালাত পড়বে। কেননা কঠিন উত্তাপ জাহান্নামের আগুনের তীব্ৰতা থেকে হয়।
---বুলুগুল মারাম (তাওহীদ), হাদিস নং- ১৫৯।

[ বুখারী ৫৩৬; মুসলিম, ৬১৫০; হাদীসের “الإبراد“ যুহর সালাতকে ঠাণ্ডা হওয়া সময় পর্যন্ত বিলম্ব করা। ]

--: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম :--

إِنَّهُۥ لَقَوْلُ رَسُولٍ كَرِيمٍ

অর্থ: নিশ্চয়ই এ কুরআন সম্মানিত রাসূলের আনীত বাণী।
(সূরা আত-তাকভীর, আয়াতঃ ১৯)

তাফসীর: এখানে সম্মানিত বাণীবাহক رَسُوْلٍ كَرِيْمٍ বলতে অহী আনার কাজে লিপ্ত ফেরেশতা জিবরাঈল আলাইহিস্ সালামকে বোঝানো হয়েছে। পরবর্তী আয়াতে এ-কথাটি আরো সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে। নবী-রাসূলগণের মতো ফেরেশতাগণের বেলায়ও রাসূল শব্দ ব্যবহৃত হয়। উল্লেখিত সবগুলো বিশেষণ জিবরাঈল আলাইহিস্ সালাম এর জন্যে বিনা দ্বিধায় প্রযোজ্য। তিনি যে শক্তিশালী, তা অন্যত্রও বলা হয়েছে, عَلَّمَهٗ شَدِيْدُالْقُوٰى “তাঁকে শিক্ষা দান করে শক্তিশালী” [সূরা আন-নাজম: ৫] । তিনি যে আরশ ও আকাশবাসী ফেরেশতাগণের মান্যবর তা মি'রাজের হাদীস দ্বারা প্ৰমাণিত আছে; তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাথে নিয়ে আকাশে পৌছলে তাঁর আদেশে ফেরেশতারা আকাশের দরজাসমূহ খুলে দেয়। তিনি যে أمين তথা বিশ্বাসভাজন তা বর্ণনার অপেক্ষা রাখে না; আল্লাহ্ তা’আলা নিজেই তার আমানত বা বিশ্বস্ততার ঘোষণা দিয়েছেন, তাকে অহীর আমানত দিয়েছেন। [ইবন কাসীর, কুরতুবী]

আর কুরআনকে “বাণীবাহকের বাণী” বলার অর্থ এই নয় যে, এটি ঐ সংশ্লিষ্ট ফেরেশতার নিজের কথা। বরং “বাণীবাহকের বাণী” শব্দ দু‘টিই একথা প্ৰকাশ করছে যে, এটি সেই সত্তার বাণী যিনি তাকে বাণীবাহক করে পাঠিয়েছেন। সূরা ‘আল-হাক্কা’র ৪০ আয়াতে এভাবে কুরআনকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী বলা হয়েছে। সেখানেও এর অর্থ এই নয় যে, এটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিজের রচনা। বরং একে “রাসূলে করীমের” বাণী বলে একথা সুস্পষ্ট করা হয়েছে যে, আল্লাহ্র রাসূল হিসেবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটি পেশ করছেন, মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ হিসেবে নয়। উভয় স্থানে বাণীকে ফেরেশতা ও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে সম্পর্কিত করার কারণ হচ্ছে এই যে, আল্লাহ্র বাণী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে বাণীবহনকারী ফেরেশতার মুখ থেকে এবং লোকদের সামনে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ থেকে উচ্চারিত হচ্ছিল। [বাদায়িউত তাফসীর]

(তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া)

--: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম :--

عَبَسَ وَتَوَلّٰىٓ

অর্থ: তিনি ভ্ৰকুঞ্চিত করলেন এবং মুখ ফিরিয়ে নিলেন,
(সূরা আবাসা, আয়াতঃ ১)

সূরা সম্পর্কিত তথ্যঃ

এ সূরাটি সাহাবী আবদুল্লাহ্ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু এর সাথে বিশেষভাবে জড়িত। তাঁর মা উম্মে মাকতুম ছিলেন খাদীজা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার পিতা খুওয়াইলিদের সহোদর বোন। তিনি ছিলেন নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের শ্যালক। বংশ মর্যাদার দিক দিয়ে সমাজের সাধারণ শ্রেণীভুক্ত নন বরং অভিজাত বংশীয় ছিলেন। আবদুল্লাহ্ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু অন্ধ হওয়ার কারণে জানতে পারেননি যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্যের সাথে আলোচনারত আছেন। তিনি মজলিসে প্রবেশ করেই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আওয়াজ দিতে শুরু করেন এবং বার বার আওয়াজ দেন। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কুরআন এর একটি আয়াতের পাঠ জিজ্ঞাসা করেন এবং সাথে সাথে জওয়াব দিতে পীড়াপীড়ি করেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন মক্কার কাফের নেতৃবর্গের সাথে আলোচনায় মশগুল ছিলেন। এই নেতৃবর্গ ছিলেন ওতবা ইবনে রবীয়া, আবু জাহল ইবনে হিশাম এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পিতৃব্য আব্বাস। তিনি তখনও মুসলিম হননি। এরূপ ক্ষেত্রে আবদুল্লাহ্ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু এর এভাবে কথা বলা এবং মামুলী প্রশ্ন নিয়ে তাৎক্ষনিক জওয়াবের জন্য পীড়াপীড়ি করা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে বিরক্তিকর ঠেকে। এই বিরক্তির প্রধান কারণ ছিল এই যে, আবদুল্লাহ্ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু পাক্কা মুসলিম ছিলেন এবং সদা সবৰ্দা মজলিসে উপস্থিত থাকতেন। তিনি এই প্রশ্ন অন্য সময়ও রাখতে পারতেন। তাঁর জওয়াব বিলম্বিত করার মধ্যে কোন ধর্মীয় ক্ষতির আশংকা ছিল না। কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলা নবীর এ বিরক্তি প্রকাশ পছন্দ করলেন না। তিনি আয়াত নাযিল করে তার প্রতিকার করেন। [দেখুন: তিরমিয়ী: ৩৩২৮, ৩৩৩১, মুয়াত্তা মালেক: ১/২০৩]

___________________

আর عبس শব্দের অর্থ রুষ্টতা অবলম্বন করা এবং চোখে মুখে বিরক্তি প্ৰকাশ করা। تولى শব্দের অর্থ মুখ ফিরিয়ে নেয়া। [জালালাইন|

(তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া)

আবূ নু’আইম (রহঃ) ... আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, জুম্মার দিন উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) খুতবা দিচ্ছিলেন, এমন সময় এক ব্যাক্তি মসজিদে প্রবেশ করেন। উমর (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, সালাতে সময়মত আসতে তোমরা কেন বাধাগ্রস্থ হও? তিনি বললেন, আযান শোনার সাথে সাথেই তো আমি উযূ করেছি। তখন উমর (রাঃ) বললেন, তোমরা কি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে একথা বলতে শোননি যে, যখন তোমাদের কেউ জুম্মার সালাতে রওয়ানা হয়, তখন সে যেন গোসল করে নেয়।
---বুখারী শরীফ (ইফাঃ), হাদিস নং- ৮৩৮।

আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সমুদ্রের পানি পবিত্র এবং তার মৃত প্রাণী হালাল।
---বুলুগুল মারাম (তাওহীদ), হাদিস নং- ১।

চারজন এ হাদীস বর্ণনা করেছেন। শব্দ বিন্যাস আবূ শাইবার, ইবনু খুযাইমাহ ও তিরমিযী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। ইমাম মালিক, শাফি’ঈ ও আহমাদ বিন হাম্বালও এটি বর্ণনা করেছেন।[1]

[আবু দাউদ ৮৩, নাসায়ী ১/৫০, ১৭৬, ৭০৭, তিরমিযী ৬৯, ইবনু মাযাহ ৩৮৬, ইবনু আবী শায়বাহ ১৩১, ইবনু খুযাইমাহ ১১১। সফওয়ান বিন সুলাইম সূত্রে; তিনি আলে বানী আযরাকে এর সাঈদ বিন সালামাহ (রাঃ) থেকে, তিনি বানী আব্দুদ দার এর মুগীরাহ বিন আবু বুরদাহ থেকে বর্ণনা করেন। তিনি আবু হুরায়রাহ (রাঃ) কে বলতে শুনেছেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা সমুদ্রে বিচরণ করি, আর আমাদের সাথে অল্প পরিমাণ পানি নিয়ে যাই, ফলে আমরা যদি এই পানি দিয়ে অযূ করি তাহলে আমাদের খাবার পানির পিপাসায় ভোগার আশংকা রয়েছে। সুতরাং আমরা কি সমুদ্রের পানি দিয়ে অযূ করতে পারি? অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ উক্তি করেন। ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন। মুহাক্কিক সুমাইর আয-যুহাইরি বুলুগুল মারামের ব্যাখ্যা গ্রন্থে বলেন, এই সনদ সহীহ । কেউ আবার এতে ক্ৰটি আছে বলে মন্তব্য করলেও তাতে কোন ক্ষতি নেই, কেননা হাদীসটির কয়েকটি শাহেদ (সমর্থক) হাদীস রয়েছে। ]

আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যাক্তি আমার আনুগত্য করে সে আল্লাহ্‌রই আনুগত্য করে এবং যে ব্যাক্তি আমার অবাধ্যাচরণ করে সে আল্লাহ্‌রই অবাধ্যাচরণ করে।
---সুনান ইবনু মাজাহ (তাওহীদ), হাদিস নং- ৩।

তাখরীজ কুতুবুত সিত্তাহ: বুখারী ২৯৫৭, মুসলিম ১৮৩৫, নাসায়ী ৪১৯৩, ৫৫১০, আহমাদ ৭৩৮৬, ৭৬০০, ২৭৩৫০, ৮৩০০, ৮৭৮৮, ৯১২১, ৯৭৩৯, ১০২৫৯। তাহক্বীক্ব আলবানী: সহীহ। তাখরীজ আলবানী: ইরওয়াউল গালীল ৩৯৪।

14-Feb-2021 তারিখের কুইজ
(অংশগ্রহণ করেছেন: 2138+)
প্রশ্নঃ উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট বা ন্যাটো ( NATO), ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলোর পারস্পরিক সামরিক সহযোগিতা প্রদানে অঙ্গীকারবদ্ধ। আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাড়ে অবস্থিত উত্তর আমেরিকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা এবং ইউরোপের অধিকাংশ দেশ এই জোটের সদস্য। এছাড়া তুরস্কও এই জোটের সদস্য। প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ১২টি। ন্যাটোর বর্তমান সদর দপ্তর যদিও বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে, পূর্বে এর সদর দপ্তর ছিলো ফ্রান্সের প্যারিসে। এই সামরিক জোটের এস্যোসিয়েট সদস্য দেশ রাশিয়া সদস্য নয়। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তুরস্ক ও আলবেনিয়াই কেবল মুসলিম দেশ। ন্যাটোর বর্তমান সদস্য-দেশের সংখ্যা ৩০। কমনওয়েলথ এর সদর দপ্তর কোথায় অবস্থিত?
(A) জেনেভা, সুইজারল্যান্ড
(B) ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র
(C) লন্ডন, যুক্তরাজ্য